বিতর্কের বিষয় : বিজ্ঞান শিক্ষা আর বিজ্ঞানমনস্কতা সম্পূর্ণ পৃথক ।
মতের পক্ষে : বিজ্ঞানের গভীর জ্ঞানের অর্থ বিজ্ঞানমনস্কতা নয়। বিজ্ঞান শিক্ষা কখনোই মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে না। বিজ্ঞান পাঠের উদ্দেশ্য আধুনিক হওয়া, কেবল বিজ্ঞানে জ্ঞানার্জন। তার ব্যবহারিক প্রয়োগ জরুরি নয়।
বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিজ্ঞান-মনস্কতা:
মতের বিপক্ষে :
সৃষ্টির আদিম যুগে, যখন মানুষ প্রথম এ পৃথিবীতে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলো, সেদিন তার বিস্ময়ের অন্ত রইল না। সেইসঙ্গে প্রতিকূল নিসর্গ-প্রকৃতির ভ্রুকুটিভঙ্গি মানুষকে শঙ্কাবিহ্বল করে তুললো। অথচ এই প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে, সম্পূর্ণ সহায় সম্বলহীন, হিংস্র শ্বাপদের সঙ্গে সংগ্রামরত মানুষ তার শাণিত বুদ্ধি, অজানাকে জানার কৌতূহল ও তার সৃজনী প্রতিভার সাহায্যে গড়ে তুললো সভ্যতা, সমাজ, ধীরে ধীরে প্রকৃতির হাত থেকে তার রহস্যভাণ্ডারের চাবি কেড়ে নিয়ে,উন্মোচন করলো বিপুলব্যাপ্ত জড়-বিশ্বের বিচিত্র তথ্যসমূহ – জন্ম হলো বিজ্ঞানের।
বিজ্ঞানের জন্মলগ্নে রয়েছে মানুষের প্রয়োজনের তাগিদ, কিন্তু মানুষ তো শুধু প্রয়োজনের দাস নয়। প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে ক্রমশ সে পা বাড়িয়েছে অপ্রয়োজনের উদার ক্ষেত্রে অনিশেষ কৌতূহলের জগতে। আর বিজ্ঞানের অশ্রান্ত অভিযানে বিজ্ঞানসাধকগণ মেতেছেন নিত্যনতুন উদ্ভাবনে। আজ মানবসভ্যতার যে অভ্রংলিহ সৌধ নির্মিত হয়েছে, তার পিছনে বিজ্ঞানের দান অপরিসীম। বাষ্পশক্তি আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞানের যে জয়যাত্রার শুভ সূচনা হয়েছিল, সেই জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।
আর তাই অরণ্যচারী গুহাবাসী মানুষ আজ পাড়ি দিচ্ছে গ্রহেগ্রহান্তরে, কলকারখানা, দ্রুতগামী যানবাহন, রেডিয়ো, টেলিভিশন, টেলিফোন, কম্পিউটার এবং মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্রের মধ্যে যতই বিজ্ঞান তার অগ্রগতির স্বাক্ষর রাখছে, ততই মানুষের বিজ্ঞান সাধনা আরও বেড়ে চলেছে। সেই সাধনার একটি দিক হলো মানুষকে বিজ্ঞান সচেতন করে তোলা। আর এই বিজ্ঞান সচেতনতা জাগ্রত করতে ব্যাপক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রচলনও হয়েছে।
বিজ্ঞান এখন বিভক্ত হয়ে গেছে বিভিন্ন শাখায়-উপশাখায়, সেখানে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বা আই. টি. সেকশন সবই আছে। এইসব শাখা-উপশাখায় ক্রমাগত নানা গবেষণা আর আবিষ্কার মানুষকে দিচ্ছে জয়ের আনন্দ। বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমাদের ভারতবর্ষও আজ পিছিয়ে নেই। আচার্য জগদীশচন্দ্র ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের উত্তরসূরি বিজ্ঞান সাধকগণ সর্বাধিক কৃতিত্বের পরিচয় দিচ্ছেন পদার্থবিদ্যা ও জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। সেইসঙ্গে প্রযুক্তিবিদ্যায় ও পরমাণুবিজ্ঞানেও যথেষ্ট দক্ষতার প্রমাণ রাখছেন বৈজ্ঞানিকগণ। বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানশাখা ও উপশাখা প্রচলিত হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দানুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারে। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরেও পরিতাপের বিষয় যে আজও মানুষের মানসিক অগ্রগতি ও মুক্তবুদ্ধির প্রসার ঘটেনি।
মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর করতে হলে প্রয়োজন মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা। শুধু বিজ্ঞান-শিক্ষা বা মুষ্টিমেয় বিজ্ঞানসাধকদের দ্বারা বিজ্ঞানের উন্নতি নয়, চাই সর্বসাধারণে বৈজ্ঞানিক চেতনার জাগরণ। কার্যকারণহীন অযৌক্তিক ক্ষতিকারক সংস্কারই হলো কুসংস্কার, যা মানুষকে পরিবার, সমাজ, এমনকি জাতিগতভাবে পঙ্গু করে দেয়। ভারতবর্ষে আধুনিক বিজ্ঞানসাধনার মহান ঋত্বিক, ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’ প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন ‘প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে আমি অধ্যাপনার কাজ করে আসছি এবং সেই উপলক্ষ্যে কত হাজার হাজার ছাত্রকে বুঝিয়ে দিয়েছি যে, সূর্য এবং চন্দ্রগ্রহণ রাহু নামক কোনো রাক্ষসের ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টায় সংঘটিত হয় না, এর মধ্যে রাহুর আক্রমণ এবং তার মুখগহ্বর থেকে চন্দ্রসূর্যের নিষ্কৃতি ও মুক্তির যে মিথ্যা এবং কাল্পনিক কাহিনি রচিত হয়েছে তা ঝুটা।’ কিন্তু তাঁর এই সত্যজ্ঞাপনের চেষ্টা কখনোই ফলপ্রসূ হয়নি, সেই কারণেই গ্রহণের দিন যেইমাত্র ঘরে ঘরে শঙ্খ-ঘন্টা বেজে ওঠে, ‘অমনি সেইসব সত্যের পূজারিরাও সকল শিক্ষা-দীক্ষার জলাঞ্জলি দিয়ে দলে দলে ভিড়তে আরম্ভ করে এবং ঘরে ঘরে অশৌচান্তের মতো হাঁড়িকুড়ি ফেলার ধুম লেগে যায়।'
আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছেও এই চিত্র বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হয়নি। সেই কারণেই তীব্র শ্রবণবিদারী স্বরে ঢাক-ঢোল সহযোগে কীর্তন বা অজানা-ধ্বনির সম্প্রসারণ কখনও বৈজ্ঞানিক চেতনাকে পরাজিত করে, এখনও ভ্রান্ত অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় উন্মাদনা বহু বিজ্ঞানসম্বন্ধীয় ব্যক্তিকে, পদার্থবিদ্যার ‘পৃষ্ঠটান’ তত্ত্ব বিস্মৃত হয়ে গণেশের দুগ্ধপানে বিস্মিত করে। সেক্ষেত্রে অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিতদের গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, সতীদাহ, ডাইনি হত্যা, ঝাড়ফুঁক, তুক্তাক্, সর্প-দংশনে ওঝার আগমনে আশ্চর্য হবার তো কিছুই নেই। একথা আজ অনস্বীকার্য যে বিজ্ঞানের আলোক মানুষের কুসংস্কারের মূলে আঘাত করতে অক্ষম। তাই, কলেরা বসন্ত রোধে টীকা না দিয়ে শীতলা পূজো করা হয়, সর্পদংশনে ওঝাকে ডাকা হয় যা অনেক সময় মানবজীবন হানিও ঘটায়।
আজও এইডস্ রোগী, এমনকি কুষ্ঠরোগীকেও সমাজে ‘একঘরে’ হয়ে থাকতে হয়। এই সকল কুসংস্কারগুলির মূলে আছে আত্মশক্তিতে বিশ্বাসহীনতা ও বিজ্ঞান মনস্কতার অভাব। এমনকি শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিজ্ঞানোন্নত সুসভ্য দেশগুলিতেও রয়েছে গাড়ীতে চলার পথে বিড়াল পার হলে গাড়ী থামিয়ে দেওয়া, সমুদ্রযাত্রায় কালো বিড়ালকে সঙ্গে নেওয়া, অশ্বখুরের লোহার নাল দরজায় লাগিয়ে রাখা, ১৩ সংখ্যাকে দুর্ভাগ্যসূচক ও ৬৬৬ সংখ্যাকে শয়তানের সংখ্যা রূপে চিহ্নিত করার মতো অসংখ্য কুসংস্কার।
সর্বসাধারণে বিজ্ঞানমনস্কতার উন্মেষ ঘটাতে হলে বিজ্ঞানকে যাঁরা পেশার ক্ষেত্রে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, তাঁদেরকেই প্রথম বিজ্ঞানকে মর্মে গ্রহণ করতে হবে। তাঁরাই বিজ্ঞানের জয়যাত্রার কাণ্ডারী, তাঁরাই যদি বিজ্ঞানমনস্ক না হতে পারেন, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চেতনা কী করে জাগ্রত হবে? মানুষের কুসংস্কার দূর করে, তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার সাধনা তাঁদের। যে আত্মবিশ্বাস একদিন এই পৃথিবীর সমস্ত বিপদসংকুল প্রতিকূলতাকে জয় করে এক সুন্দর, সভ্যতা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল, আজ তারই অভাব দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞানসাধকদের সেই আত্মবিশ্বাস পুনরায় প্রতিস্থাপনের দায়িত্ব নিতে হবে। ভারতে এই বিষয়ে তাদের সাহায্য করতে গঠিত হয়েছে ‘জনবিজ্ঞান জাঠা’। সেইসঙ্গে গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, দূরদর্শন, চলচ্চিত্র, বেতার-বার্তা, সংবাদপত্র প্রভৃতি ,গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের বুক থেকে কুসংস্কার সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হবে তখনই যখন শিক্ষিত উদারচেতা বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিবর্গ নিজেদের বিজ্ঞানমনস্কতা প্রমাণ করবেন।
0 Comments