রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনী// শান্তিনিকেতন এর উদ্দেশ্য //শান্তিনিকেতনের শিক্ষার বৈশিষ্ট্য :
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উনিশ শতকের অন্তিমলগ্নে যে মহামানব জ্ঞানের আলোর দ্বীপটিকে জ্বালিয়ে রাখার জন্য আত্মোৎসর্গ করলেন তিনি হলেন আমাদের জাতীয় জীবনের প্রধান জ্যোতিষ্ক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
সাহিত্যে , শিল্পে , সমাজ সংস্কারে মানব জীবনের প্রতিটি অলিন্দে তাঁর অবদান রয়েছে ।
১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৬ মে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের জন্ম । তাঁর বিদ্যালয় ছিল প্রধানত গৃহ - পরিবেশ , তবুও তাঁকে কিছু সময়ের জন্য বিদ্যালয়ে যেতে হয়েছিল । সেখানে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয় তা অত্যন্ত নেতিবাচক যা সারাজীবন তিনি ভোলেননি , আর যার প্রতিক্রিয়ার ফসল হল শান্তিনিকেতন । রবীন্দ্রনাথ যেমন ভাববাদী ছিলেন অপরদিকে তেমনি তিনি প্রকৃতিবাদী ছিলেন যা তাঁর শিক্ষাচিন্তায় প্রতিফলিত হয়।
শিক্ষার সংজ্ঞা :
রবীন্দ্রনাথের মতে শিক্ষা হল , বিশ্ব - প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের দ্বারা মানুষকে প্রকৃত মানুষ । হিসাবে গড়ে তোলা ।
শিক্ষার লক্ষ্য ( Aims of Education ) : রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার যেসকল লক্ষ্যের কথা বলেছেন , তা হল –
( ১ ) ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশসাধন রবীন্দ্রনাথের মতে , শিক্ষার লক্ষ্য হল শিশুর ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশসাধন ।
( ২ ) ধর্মীয়ভাব জাগ্রত করা : শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয়ভাব জাগ্রত করা , যাতে সে পরম সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে ।
( ৩ ) নৈতিক ও চারিত্রিক বিকাশ : ভারতীয় আদর্শের সঙ্গে সংগতি রেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক ও চারিত্রিক গুণগুলির বিকাশসাধন করা ।
( ৪ ) বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করা
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার একটি অন্যতম লক্ষ্য হল , শিক্ষার্থীর মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করা । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
( ৫ ) সামাজিক বিকাশসাধন : সামাজিক বিকাশসাধনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সার্থকভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করা । •
পাঠক্রম :
রবীন্দ্রনাথের পাঠক্রম হবে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক । তাই তিনি পাঠক্রমের মধ্যে ভাষা , সাহিত্য , দর্শন , বিজ্ঞান , শিল্প - কলা , সংগীত ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন । তাঁর পাঠক্রমে শিল্পকলা , নৃত্যকলা ইত্যাদির পাশাপাশি পাশ্চাত্য শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছেন ।
শিক্ষণ পদ্ধতি:
রবীন্দ্রনাথ পাঠদানের ক্ষেত্রে ভ্রমণ , প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ , গল্পের ছলে পাঠদান এবং প্রত্যক্ষ কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেন ।
তিনি বলেছেন , যে - কোনো আদর্শ শিক্ষণ - পদ্ধতি তিনটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করবে
( ক ) স্বাধীনতা
( খ ) সৃজনাত্মক আত্মপ্রকাশের সুযোগ
( গ ) প্রকৃতির সঙ্গে সক্রিয় সংযোগ । তিনি মুখস্থ নির্ভর শিক্ষণ পদ্ধতির বিরোধী ছিলেন ।
শিক্ষক - শিক্ষার্থীর সম্পর্ক :
রবীন্দ্রনাথের মতে , শিক্ষক হবেন প্রাণবন্ত মানুষ । শিশুর মতো সারল্য নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীর মনোরাজ্যে বিচরণ করবেন । শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে । এক কথায় একটি আনন্দময় পরিবেশে পারস্পরিক মত বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শিক্ষার কাজ এগিয়ে চলবে ।
শিক্ষার মাধ্যমঃ
রবীন্দ্রনাথ শিক্ষায় মাতৃভাষাকে মাতৃ দুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন । তিনি শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন ।
শৃঙ্খলা :
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে , শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দিলে তারা আপনা থেকে শৃঙ্খলিত হয়ে পড়বে । তবে এ কথাও ঠিক স্বাধীনতা কখনোই স্বেচ্ছাচারে পরিণত হবে না ।
জনশিক্ষা :
জনশিক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের কাছে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে সুরুল গ্রামে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পল্লি উন্নয়নের কাজ শুরু করেছিলেন । গ্রামোন্নয়ন বিষয়টিকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা পরিকল্পনার মধ্যে রেখেছিলেন । শান্তিনিকেতনে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাদানের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেই অঞ্চলের নিকটবর্তী গ্রামবাসীর কাছে শিক্ষার সুফল পৌঁছে দেওয়া ।
শিক্ষাচিন্তার ব্যবহারিক দিকঃ
রবীন্দ্রনাথ ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে শান্তিনিকেতনের কাছে শ্রীনিকেতনে ' শিক্ষাসত্র ' নামে একটি গ্রামীণ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন । ব্যবহারিক দিক থেকে শিক্ষার উন্নয়নের জন্য কর্মমুখী শিক্ষা , গ্রামোন্নয়ন , অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন । তিনি গ্রামীণ বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে কৃষি , পশুপালন , হস্তশিল্প , কুটিরশিল্প বিভিন্নপ্রকার দ্রব্য সামগ্রীর উৎপাদন ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করেন । তিনি হাতেকলমে শিক্ষাদানের বিষয়টিকে সর্বত্র – সাহিত্যে , শিল্পে , শিক্ষায় , সমাজসংস্কারে প্রতিটি অলিন্দে । তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমিক । তাই তিনি ১৯২১ সালে ২২ ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম গঠন করেন । এরপরে তিনি ১৯২২ সালে সুরুল গ্রামে শ্রীনিকেতন নামক পল্লি সংগঠন বিভাগ গঠন করেন । ১৯২৪ সালে শ্রীনিকেতন শিক্ষাসত্র নামে একটি গ্রামীণ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন ।
শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্য ( Objectives of Shantiniketan ) :
( 1 ) শিক্ষার্থীকে আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ দান ।
( ২ ) শিক্ষার্থীর পরিবেশ হবে স্বাধীন ও ভালোবাসার ।
( ৩ ) প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয়সাধন ।
( ৪ ) মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞানের বিকাশসাধন ।
( ৫ ) শিশুর বৃত্তিমুখী এবং সামাজিক দক্ষতার বিকাশের ব্যবস্থা ।
( ৬ ) জাতীয় ও আন্তর্জাতিকতা বোধ বিকাশের মাধ্যমে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের আনয়ন এবং বিশ্বমানবতার বিকাশসাধন ।
( ৭ ) শিশুর দৈহিক , বৌদ্ধিক , আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য বিদ্যালয়ের পরিবেশ হবে প্রাকৃতিক , স্বাধীন , মুক্ত ও সরল ।
( ৮ ) সরল জীবনযাপন কিন্তু উন্নতচিন্তন ।
( ৯ ) শিক্ষক - শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে পিতাপুত্রের মতো । ( ১০ ) শিশুর শিক্ষা হবে প্রকৃতির কোলে । এই সকল
উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে একটি গ্রামকে স্বনির্ভর করে তোলা
এখানে আরও যে সকল বিষয়গুলি গুরুত্ব পাবে তা হল – বিদ্যালয়ে কর্মময় জীবনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারবে । কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতা ও পছন্দ অনুযায়ী বৃত্তি নির্বাচনে সুযোগ পাবে । কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্রমের প্রতি মর্যাদাবোধ গড়ে উঠবে । গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য পাঠক্রমে কৃষি , পশুপালন , বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করেন যা সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত । একটি গ্রামের উন্নয়ন তখনই ঘটবে যদি গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে এবং সংস্কৃতির বিকাশ হয় । সেইজন্য তিনি অর্থনৈতিক কাজকর্মের সাথে লেখাপড়া , অঙ্ক , গান , অভিনয় ইত্যাদি স্থান দিয়েছেন । এখানে ইন্দ্রিয় অনুশীলন , প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ , সৃজনধর্মী কাজকর্ম ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের কথা বলেছেন ।
শান্তিনিকেতন ও আশ্রমিক শিক্ষার বৈশিষ্ট্যঃ
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে যেসকল আশ্রমিক শিক্ষার বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন , তা নীচে আলোচনা করা হল –
( ১ ) স্বাধীনভাবে শিক্ষাগ্রহণ :
রবীন্দ্রনাথ তাঁর শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে অর্থাৎ নিজের ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা ও কাজের মাধ্যমে শিক্ষালাভের সুযোগ দিয়েছিলেন ।
( ২ ) প্রকৃতির মাঝে শিক্ষাদান :
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির মাঝে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন । বিদ্যালয়ের চার দেওয়ালের কৃত্রিম শিক্ষায় তিনি পক্ষপাতি ছিলেন না । এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা দান করা সম্ভব নয় । শান্তিনিকেতনে তাই তিনি মুক্ত আকাশের নীচে গাছের তলায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছেন ।
(৩ ) সহপাঠ্যক্রমিক ও সৃজনমূলক কাজে অংশগ্রহণ :
শান্তিনিকেতনে বিভিন্ন ধরনের সহপাঠ্যক্রমিক কাজ এবং সৃজনমূলক কাজে অংশগ্রহণের বিশেষ সুযোগ রয়েছে । শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলিতে যোগদানের মাধ্যমে তাদের দৈহিক , মানসিক , সামাজিক , প্রাক্ষোভিক , সৃজনশীল ক্ষমতা প্রভৃতির বিকাশসাধনের ব্যবস্থা রয়েছে ।
( 8 ) শিক্ষার্থীর চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষার ব্যবস্থা :
রবীন্দ্রনাথ তাঁর শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বা চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষালাভের কথা বলেছেন । তিনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকে নির্দিষ্ট কোনো সময় তালিকা অনুযায়ী দেওয়ার কথা বলেননি ।
( ৫ ) শিক্ষক - শিক্ষার্থীর সম্পর্ক:
রবীন্দ্রনাথ এই সম্পর্কে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশে শিক্ষাদান করতে সাহায্য করেন । ফলে শিক্ষক - শিক্ষার্থীর সম্পর্ক মধুর হয় । এই মধুর সম্পর্কই শিক্ষার্থীকে শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহী করে তোলে ।
( ৬ ) বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা :
শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের জন্য কোনো জাতি , ধর্ম , বর্ণ এবং আর্থিক বৈষম্য দেখা হয় না । এখানে শিক্ষার্থীরা একই খাওয়া - দাওয়া , খেলাধুলা ও পড়াশোনা করে থাকে ।
( ৭ ) কৃষ্টি ও সংস্কৃতি শিক্ষার ভিত্তি :
ভারতীয় কৃষ্টি , সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার ওপর উচ্চধারণা পোষণ করতেন । শান্তিনিকেতনে শিক্ষালাভ করে যাতে শিশুরা ভারতীয় কৃষ্টি , সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিজে গর্ব অনুভব করে , সেই প্রচেষ্টা দেখা যায় ।
( ৮ ) মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান :
রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন । তাই তিনি শান্তিনিকেতনে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছেন । যথার্থ শিক্ষাদান মাতৃভাষার মাধ্যমেই সম্ভব ।
( ৯ ) হস্তশিল্পের মাধ্যমে শিক্ষাদান :
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে হস্তশিল্পের মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছেন । এখানে নানারকম কুটিরশিল্প , তাঁত শিল্প , কৃষিকাজ , চামড়ার কাজ , মাটির কাজ , উদ্যানের পরিচর্যা প্রভৃতির শিক্ষা দেওয়া হয় ।
( ১০ ) সমাজসেবা ও পল্লি উন্নয়ন :
শান্তিনিকেতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল সমাজসেবা ও পল্লি উন্নয়ন । সমাজসেবার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যেমন পল্লি উন্নয়নে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায় তেমনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সংযোগস্থাপন করা যায় । সমাজের প্রতিটি মানুষের এই দুটি কাজই গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম । শান্তিনিকেতনের আবশ্যিক কর্ম হল এই ধর্মের অনুশীলন।
0 Comments