ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি কাকে বলে ? এর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি আলোচনা করা হলো।
ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণের পক্ষে মতগুলি হল -
1.সরকারি কাজের সুবিধা : ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণের সপক্ষে যেসব যুক্তি প্রদর্শন করা হয়, তার মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য হল সরকারের কার্যাবলি রূপায়ণের সুবিধা। সরকারের তিনটি প্রধান ক্ষমতা তিনটি বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হলে সরকারের কাজের সুবিধা হয় এবং কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।
2. ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা : মন্তেস্কু বলেছেন, একই ব্যক্তি বা সংস্থার হাতে আইন রচনা ও শাসন ক্ষমতা থাকলে জনগণের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। তা ছাড়া আইন ও শাসনবিভাগ থেকে বিচারবিভাগরে আলাদা করা না হলে ব্যক্তিস্বাধীনতা বিনষ্ট হবে।
3. দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি : তিনটি বিভাগ পৃথক পৃথক দায়িত্ব পালন করায়, প্রত্যেক বিভাগের দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পায়, ফলে প্রত্যেক বিভাগের কর্মদক্ষতা যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ে। দায়িত্বশীলতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ফলে সরকারের কাজের গতিও বেড়ে যায়।
4. স্বৈরতন্ত্র থেকে রক্ষা : তিনটি বিভাগ আইনবিভাগ, শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগ নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন ও অপর বিভাগ কর্তৃক অনিয়ন্ত্রিত থাকায় স্বৈরতন্ত্রের সম্ভাবনা কম থাকে, স্বেচ্ছাচারিতাও বন্ধ হয়।
সরকারের বিভিন্ন বিভাগ
5. গণতন্ত্রের শর্ত: গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতি। এই নীতি কার্যকারী হলে অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ ও অবৈধ কাজকর্ম প্রতিরোধ করা যায়। তাই প্রায় সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এই নীতি কঠোরভাবে অথবা সীমিতভাবে মেনে চলে।
ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণের বিপক্ষে মতগুলি হল—
1. মূলতত্ত্ব গঠনে বিভ্রান্তি : ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করা হয়ে থাকে। প্রথমেই বলা হয় সরকারের তিনটি বিভাগ ধরে নিয়ে মন্তেস্কু যে ক্ষমতার বিভাজন করেছেন, সেই তত্ত্বের মূলেই ভ্রান্তি থেকে গেছে। কারণ আপাতদৃষ্টিতে তিনটি বিভাগ হলেও প্রত্যেক বিভাগের সঙ্গেই বহু উপবিভাগ আছে।
তাই বহু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ছয়টি বিভাগের কথা বলেছেন। এই ছয়টি বিভাগ হল— (a) আইনবিভাগ, (b) শাসনবিভাগ, (c) বিচারবিভাগ, (d) শাসনবিভাগের কর্মকর্তাগণ, (e) শাসনবিভাগের কর্মচারীগণ, (f) নির্বাচক মণ্ডলী। তা ছাড়া সরকারের কার্যাবলি সবসময় নির্দিষ্ট বিভাগ দ্বারা পরিচালিত হয় না। আধুনিক যুগে কাজের চাপে তা সম্ভব হয় না।
2. কর্মসূচি রূপায়ণে সমস্যা : সরকারের মুখ্য উদ্দেশ্য হল কর্মসূচি ও আদর্শকে রূপায়িত করা। কোনো কর্মসূচিকে রূপায়িত করতে সব বিভাগের পারস্পরিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতির ফলে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন সম্ভব হয় না।
3. জটিল পরিস্থিতি : বর্তমানে প্রত্যেক সরকারের জাতীয় সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ও জটিল হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দায়িত্বও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ করলে সরকারের স্থায়িত্ব ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে। তাতে দেশ জনগণ উভয়ের ক্ষতি হবে। তাই এই নীতিকে অকাম্য বলা হয়ে থাকে।
4. বাস্তবে প্রয়োগ অসম্ভব : বাস্তবে আলোচ্য নীতির কঠোর প্রয়োগ সম্ভব নয়। কারণ প্রকৃতপক্ষে আইনবিভাগ, শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগ বিশেষ করে প্রথম দুটি বিভাগ পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া চলতে পারে না। তাই তাদের বিভাজন সম্ভব নয়। যেমন, আইনবিভাগ নিজ কর্মচারী ও সদস্যদের অপরাধের বিচার ও শাস্তিবিধান নিজেই করে থাকে তেমন, কোনো সদস্যকে সভা থেকে বহিষ্কার, সাসপেন্ড বা সদস্যপদ খারিজ আইনসভা নিজেই করে। শাসনবিভাগ প্রয়োজনে কর্মচারী পরিচালনার জন্য নিজেই নিয়মকানুন তৈরি করে, অনেক সময় সভা না চললে অর্ডিন্যান্স জারি করে। বিচারবিভাগ নিজ কর্মচারীদের নিয়োগ ও পরিচালনা নিজেই করে থাকে এবং নিজ বিচারবুদ্ধি, ন্যায়-অন্যায়ের ভিত্তিতে বিচার করে। আবার বিচারবিভাগীয় সক্রিয়তার (Judicial Activism) মাধ্যমে প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে থাকে।
5. একাধিক বিভাগে একই ব্যক্তি : এক ব্যক্তি একাধিক বিভাগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে না এটাই ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণের অন্যতম নীতি। অথচ বাস্তবে একই ব্যক্তি একাধিক বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। উদাহরণ স্বরূপ ইংল্যান্ডের রাজা-রানির কথা বলা যায়। রাজা বা রানি একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান অর্থাৎ শাসনবিভাগের সঙ্গে যুক্ত আবার তিনি পার্লামেন্টের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই প্রথা ভারতের রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তা ছাড়া ভারত, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে শাসকদলের সদস্যরাই মন্ত্রী হচ্ছেন অর্থাৎ আইনসভার সদস্য একই সঙ্গে মন্ত্রীসভার সদস্য। এখানে ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতির প্রকৃত প্রয়োগ ঘটেনি।
6. দায়িত্বহীনতা আলোচ্য নীতির ফলে সরকারের বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বহীনতা বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে যায়। কারণ কোনো কাজ বা কর্মসূচি ব্যর্থ হলে এক বিভাগ অন্য বিভাগের ওপর দোষারোপ করে নিজ দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। ফলে সরকারের সাফল্যও ব্যাহত হয়।
পূর্বোক্ত সমালোচনা ও ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতিকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা যায় না। কারণ এই নীতির কিছু ভালো দিক আছে। সম্ভবত এই কারণেই মন্তেস্কুর মৃত্যুর কয়েকশো বছর পরেও তাঁর নীতি নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে। আসলে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাস্বতন্ত্রীকরণ নীতি প্রয়োগ বাস্তবে সত্যিই সম্ভব নয়। তবে আংশিকভাবে বা সীমিতভাবে এই নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। বাস্তবে ভারতসহ সব দেশ সেইভাবেই এই নীতিকে গ্রহণ করেছে। সেক্ষেত্রে বিচারবিভাগকে যথাসম্ভব পৃথক রেখে আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

0 Comments