রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও । রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে কেন ' প্রগতিশীল বিজ্ঞান ' হিসেবে অভিহিত করা হয় ? 6 + 2
![]() |
| রাষ্ট্রবিজ্ঞান সংজ্ঞা দাও // রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল একটি প্রগতিশীল বিজ্ঞান কে বলেছেন // রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রগতিশীল বিজ্ঞান |
উত্তর :
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা - রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া বেশ কঠিন । রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন । যেমন–
[ 1 ] ঐতিহ্যবাহী বা সাবেকি সংজ্ঞা ,
[ 2 ] আধুনিক সংজ্ঞা ও
[ 3 ] মার্কসবাদী সংজ্ঞা ।
[ 1 ] ঐতিহ্যবাহী বা সাবেকি সংজ্ঞা
i . রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংজ্ঞা : রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ঐতিহ্যবাহী বা সাবেকি সংজ্ঞা মূলত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক । রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির গঠন ও কার্যাবলি , রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় ঐতিহ্যবাহী সংজ্ঞায় প্রাধান্য পেয়েছে । সেই কারণে ঐতিহ্যবাহী সংজ্ঞাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংজ্ঞা বলে অভিহিত করা হয় । গেটেলের অভিমত অনুযায়ী , রাষ্ট্রের অতীত , বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হল রাষ্ট্রবিজ্ঞান | ব্লুন্টসলি বলেন , রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল রাষ্ট্রের বিজ্ঞান । গার্নারের বক্তব্য হল , রাষ্ট্রকে নিয়েই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শুরু ও সমাপ্তি ।
ii . সরকারকেন্দ্রিক সংজ্ঞা : সিলি , ক্যাটলিন প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলতে এমন কিছুকে বুঝিয়েছেন , যা সরকার সম্পর্কিত বিষয়ে অনুসন্ধান চালায় ।
iii . রাষ্ট্র ও সরকারকেন্দ্রিক সংজ্ঞা : অধ্যাপক গিলক্রিস্টের মতে , রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কে আলোচনা করে । ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল জানে বলেছেন , সমাজবিজ্ঞানের যে শাখা রাষ্ট্রের ভিত্তি ও সরকার নিয়ে আলোচনা করে , তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে | [
[2 ] আধুনিক সংজ্ঞা : আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আলোচনার ধারাকে নাকচ করে দিয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আচরণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন । তাঁদের অভিমত হল , রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে শুধু রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত আলোচনায় সীমায়িত করে রাখলে রাজনৈতিক জীবনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যাবে না । তাঁদের মতে , রাজনৈতিক দিককে সমাজের অন্যান্য বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অবাস্তব হয়ে পড়বে । আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড ইস্টনের বক্তব্য অনুসারে , মূল্যের কর্তৃত্বমূলক বণ্টনের আলোচনা হল রাষ্ট্রবিজ্ঞান । রবার্ট ডাল ও লাসওয়েল রাজনৈতিক ক্ষমতাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন ।
লাসওয়েলের মতে , রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সমাজের প্রভাব ও প্রভাবশালীদের সম্পর্কে আলোচনা ও বিশ্লেষণ । অ্যালান বলের মতে , রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল এমন একটি বিষয় , যা সমাজভুক্ত ব্যক্তিদের বিরোধ ও বিরোধ - মীমাংসা সম্পর্কে আলোচনা করে ।
[ 3 ] মাক্সবাদী সংজ্ঞা : মার্কসবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে , সমাজের শ্রেণিসম্পর্ক ও শ্রেণিসংগ্রাম সম্পর্কিত বিচারবিশ্লেষণ হল রাষ্ট্রবিজ্ঞান | মার্কসীয় তত্ত্বে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে । মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে , রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনাকে সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলোচনা করলে তা অসম্পূর্ণ বলে পরিগণিত হবে | অর্থনীতি - নিরপেক্ষ রাজনীতির আলোচনা বিজ্ঞানসম্মত নয় বলে মার্কসবাদে দাবি করা হয় ।
পরিশেষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গিয়ে বলা যায় , রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সমাজবিজ্ঞানের এমন এক শাখা , যা বিজ্ঞানসম্মত পর্যালোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্র সম্পর্কিত তত্ত্ব , শাসনপদ্ধতি , রাজনৈতিক ব্যবস্থা , রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আচরণ , আন্তর্জাতিক সম্পর্ক , আন্তর্জাতিক আইন ও সংগঠন ইত্যাদি সম্পর্কে বিচারবিশ্লেষণ করে ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে প্রগতিশীল বিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করেছেন লর্ড ব্রাইস। রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে কে প্রগতিশীল বিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করার কারণ ব্রাইসের মতে , রাষ্ট্রবিজ্ঞান অসম্পূর্ণ বিজ্ঞান হলেও পরিবর্তিত জগতের প্রগতিশীল মানুষের রাজনৈতিক আচার - আচরণকে কেন্দ্র করে এর পরিধি বেড়ে চলেছে এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এর বিশ্লেষণও অনেক সহজ হয়েছে । তাই লর্ড ব্রাইস রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে ‘ প্রগতিশীল বিজ্ঞান ’ বলে অভিহিত করেছেন ।

0 Comments