উদারনীতিবাদ ( Liberalism )
![]() |
| উদারনীতিবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা |
উদারনীতিবাদে অর্থ : প্রাচীনকাল থেকে উদারনীতিবাদের পরিচয় পাওয়া গেলেও উদারনীতিবাদ একটি আধুনিক এবং সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতবাদ হিসেবে পরিচিত । এককথায় ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের সহায়ক ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী শাসনব্যবস্থাকে উদারনীতিবাদ বলা যায় ।
উদারনীতি সম্পর্কে এই মতবাদের অন্যতম স্রষ্টা জন লক্ বলেছেন, স্বাধীনতার অধিকার , সম্পত্তির অধিকার , ব্যক্তিগত অধিকার ও নিরাপত্তার অধিকার হচ্ছে উদারনীতিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবহাউস বলেছেন , আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজ গঠনের বিশ্বাসকে উদারনীতিবাদ বলা হয়েছে ।
উদারনীতিবাদের সংজ্ঞা : উপরোক্ত দার্শনিকদের মন্তব্য থেকে উদারনীতিবাদের একটা সংজ্ঞা তৈরি করা যেতে পারে— মূলত ব্যক্তিস্বাধীনতা , সম্পত্তির অধিকার , রাষ্ট্রের সীমিত ক্ষমতা , বাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাসী একটি মুক্ত উদার গণতান্ত্রিক মতাদর্শ হল উদারনীতিবাদ।
উদারনীতিবাদের উদ্ভব ও বিকাশ : জন গ্রে ( John Grey ) মনে করেন , সপ্তদশ শতাব্দীর আগে উদারনীতিবাদের অস্তিত্ব ছিল না । তাঁর মতে , 1612 খ্রিস্টাব্দে স্পেনে Spanish Party of Liberals নাম থেকে উদারনীতিবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা । অবশ্য বর্তমানের গবেষকগণ জন লক্কে উদারনীতিবাদের জনক বলে মনে করেন ।
এই ধারণার উৎস 1690 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত লকের লেখা Two Treatises of Government ' গ্রন্থটি । তবে বিগত তিন - চারশো বছরে উদারনীতিবাদের বহু পরিবর্তন ঘটেছে ।
উদারনীতিবাদের বৈশিষ্ট্য :
উদারনীতিবাদ নানাভাগে বিভক্ত হলেও এই দৃষ্টিভঙ্গির কয়েকটি মৌলিক সাধারণ বৈশিষ্ট্য সব ধরনের উদারনীতিবাদেই পরিলক্ষিত হয় ।
এসব মূল সূত্র বা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল -
1) ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র : রাষ্ট্রের জন্য ব্যক্তি নয় , ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র — উদারনীতিবাদীগণ এই মতবাদে বিশ্বাসী। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষা , ব্যক্তির সুখশান্তির ব্যবস্থা করা। এসবের জন্যই রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে । তাই রাষ্ট্রকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে , যাতে সে কখনোই কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের স্বাধীনতাকে খর্ব না করে । তাই উদারনীতিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল রাষ্ট্র অপেক্ষা ব্যক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা ।
2) অধিকার ও স্বাধীনতার গুরুত্ব : উদারনীতিবাদের মূলকথাই হচ্ছে ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতা । বিশেষ করে স্বাধীনতার অধিকার উদারনীতিবাদীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । কারণ মানুষ জন্ম থেকেই স্বাধীনতা ভোগ করছে । তাই রাষ্ট্র কোনো আইন দ্বারা তা রদ করতে বা কেড়ে নিতে পারে না ।
3) রাষ্ট্র নাগরিকদের দ্বারা সৃষ্ট : উদারনীতিবাদের আগে একটা ধারণা প্রচার করা হত যে রাষ্ট্রই নাগরিকদের স্রষ্টা । কিন্তু উদারনীতিবাদীরা তা মনে করেন না । তাঁদের মতে , নাগরিকগণ রাষ্ট্রের স্রষ্টা । রাষ্ট্রকে তাঁরা একটা নেতিবাচক সংস্থা হিসেবেই দেখেন । ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকাকে উদারনীতিবাদীরা স্বীকার করেন না ।
4) রাষ্ট্রের লক্ষ্য মানুষের সর্বোচ্চ সুখ : উদারনীতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু ব্যক্তির স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা নয় , সেই স্বাধীনতাকে আরও উন্নত করে ব্যক্তির সর্বোচ্চ সুখের ( Maximization of pleasure ) ব্যবস্থা করা । অর্থাৎ , উদারনীতিবাদীরা মনে করেন শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতাই মানুষের প্রধান লক্ষ্য নয় , ব্যক্তিস্বাধীনতা যেন সুখের হয় । আর এই ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করাই রাষ্ট্রের কর্তব্য ।
5) রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ : রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দুই - ই উদারনীতিবাদ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে । এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হল জনকল্যাণ । উদারনীতিবাদীদের মতে , জনকল্যাণ সাধিত হলেই রাষ্ট্রের কল্যাণসাধন হয় । উভয়ের কল্যাণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই । সুতরাং , রাষ্ট্র হচ্ছে জনকল্যাণের যন্ত্র । জনকল্যাণকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র কোনো কাজ করতে পারে না ।
6) রাষ্ট্রের উৎস সম্মতি : সম্মতিই হচ্ছে রাষ্ট্রের উৎস । এই বহুত্ববাদী ধারণা উদারনীতিবাদ সমর্থন করে । এককথায় উদারনীতিবাদ মনে করে সকলের সম্মতিতেই রাষ্ট্রের কার্যাবলি পরিচালিত হওয়া উচিত ।
7) সম্পত্তির অধিকার : উদারনীতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকারকে সুরক্ষিত করা । এই মতানুসারে রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র কর্তব্য হল ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে স্বীকৃতিপ্রদান , সংরক্ষণ ও ব্যক্তির সম্পত্তিতে অন্যের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা ।
8) ব্যক্তির বিকাশের পরিবেশ : মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের সার্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিতে সর্বদাই উদারনীতিবাদীরা সোচ্চার । তাঁদের মতে , সমাজে মানুষের মধ্যে বহুপ্রকার গুণ , প্রতিভা ও সম্ভাবনা থাকে । এগুলি যাতে বিনা বাধায় সঠিকভাবে প্রকাশ পেতে পারে তার ব্যবস্থা রাষ্ট্রের করা । পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে , যাতে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রস্ফুটিত হয় । একেই প্রকৃত স্বাধীনতা বলে উদারনীতিবাদীরা মনে করেন । অনেকে তাই উদারনীতিবাদীদের ' ব্যক্তিবাদী ' উচিত । তাই এমন ব্যবস্থা ( Individualist ) বলে থাকেন ।
9) সংখ্যালঘিষ্ঠের স্বাধীনতা : সনাতনী উদারনীতিবাদ থেকে আধুনিক নয়া উদারনীতিবাদে পৌঁছোনোর পথে এই দৃষ্টিভঙ্গির এক দীর্ঘ বিবর্তন হয়েছে । তাই স্বাভাবিক নিয়মে উদারনীতিবাদের মধ্যেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে । তেমনি একটি উল্লেখ্য পরিবর্তন হল সংখ্যালঘিষ্ঠের স্বাধীনতাকে স্বীকার করা । উদারনীতিবাদ চিরকাল গণতন্ত্রে আস্থাশীল । তবে বেশ্বাম প্রমুখ মনে করতেন , সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনব্যবস্থাই গণতন্ত্র । কিন্তু পরে জন স্টুয়ার্ট মিল ( John Stuart Mill ) ও তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন , এতে সংখ্যালঘিষ্ঠের মত ও স্বাধীনতা খর্ব হয় । তাই তাঁরা বলেন , সংখ্যালঘিষ্ঠের স্বাধীনতা ও মতকে সংরক্ষণ করাই প্রকৃত গণতন্ত্র ।
10) ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকারের সংরক্ষক : উদারনীতিবাদীদের জন স্টুয়ার্ট মিল মতে , রাষ্ট্র হল সমাজের একটি অত্যন্ত দরকারি প্রতিষ্ঠান । রাষ্ট্রকে বাদ দেওয়ার কথা উদারনীতিবাদীরা ভাবেন না । কারণ ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকারকে সংরক্ষণ ও সুনিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন । কিন্তু একইসঙ্গে আবার রাষ্ট্রের দ্বারাই ব্যক্তির অধিকার , স্বাধীনতা , সম্পত্তি প্রভৃতি বিনষ্ট হতে পারে , এমনকি ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে রাষ্ট্র বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে । এই আশঙ্কার জন্য উদারনীতিবাদীরা রাষ্ট্রকে একটি প্রয়োজনীয় মন্দ অর্থাৎ ' Necessary evil ' বলে থাকেন ।

0 Comments