swami vivekananda biography in bengali
স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী ও বাণী // স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী বাংলা
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন একজন মহান সমাজ সংস্কারক এবং ভারতের একজন অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব।
স্বামী বিবেকানন্দ পরাধীন ভারতবর্ষে স্বদেশবাসীকে সর্বপ্রথম আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলার কাজে সফল হয়েছিলেন যিনি , মৃতপ্রায় একটি জাতির দেহে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন যিনি , তিনি হলেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের প্রিয়তম শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ । তিনি উত্তর কলকাতার বিখ্যাত দত্ত পরিবারে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন । স্বামীজির জাতীয়তাবাদী আদর্শ , স্বদেশ চেতনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল পরবর্তী প্রজন্ম । এই কর্মযোগী বীরের উদাত্ত আহ্বানে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত আপামর ভারতবাসী তাদের হারিয়ে যাওয়া চেতনা ফিরে পেয়েছিল ।
অরবিন্দের মতে ,
' বিবেকানন্দই আমাদের জাতীয় জীবনের গঠনকর্তা ও প্রধান নেতা ’ ।
নবভারতের অন্যতম রূপকার স্বামীজির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ,
‘ ভারতবর্ষকে জানতে হলে বিকেকানন্দকে পড়তে ও জানতে হবে ’
( “ If you want to know India read Vivekananda . " )
বিবেকানন্দের নাম :
বিবেকানন্দকে নরেন্দ্রনাথ দত্ত নামে ডাকা হতো.. তিনি 12 জানুয়ারী 1863 সালে কলকাতায় বিশ্বনাথ দত্ত এবং ভুবনেশ্বরী দেবীর জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা একজন সফল আইনজীবী ছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই ধ্যান অনুশীলন করতেন এবং কিছু সময়ের জন্য ব্রাহ্ম আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষালয় :
বিবেকানন্দ শিক্ষার পরিবেশ হিসেবে প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষার পরিবেশকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করেছেন । তিনি বলেছেন গুরুগৃহে বাস করে গুরুর আদর্শ জীবন দ্বারা শিক্ষার্থী প্রভাবিত হবে ।
শিক্ষক :
তিনি শিক্ষকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । আগুন যেমন সবকিছুকে গ্লানিমুগ্ধ করে তেমনি শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্রের প্রভাব শিশুর সব সংকীর্ণতাকে দূর করবে ।
গণশিক্ষা :
বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন ভারতের মানুষের যথার্থ শিক্ষাব্যবস্থা হল গণশিক্ষা । বিবেকানন্দ মনে করতেন , সমাজের সাম্য আনবার একমাত্র উপায় উচ্চবর্ণের শক্তির কারণস্বরূপ শিক্ষা ও কৃষ্টি আয়ত্ত করা । জনশিক্ষা প্রসারের ফলে এক নতুন ভারত জন্ম নিক ।
“ নতুন ভারত বেরুক লাঙল ধরে , চাষার কুটির ভেদ করে , জেলে - মালো - মুচি মেথরের ঝুপড়ির মধ্যে হতে ; বেরুক , মুদির দোকান থেকে , ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে , বেরুক কারখানা থেকে , হাট থেকে , বাজার থেকে , বেরুক ঝোপ - জঙ্গল , পাহাড় - পর্বত থেকে । ”
শিক্ষক - শিক্ষার্থীর সম্পর্ক :
ছাত্র - শিক্ষক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন , গুরুগৃহে বাসের আদর্শের কথা । শিক্ষক হবেন ত্যাগী এবং সর্বজ্ঞ। শিক্ষক - শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে মধুর ।
শৃঙ্খলা :
শৃঙ্খলার কথা বলতে গিয়ে বিবেকানন্দ বলেন – যদি বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজ করতে গিয়ে ছাত্রদের স্বাধীনতা দেওয়া হয় , স্বাধীন চিন্তা করা এবং আত্মপ্রকাশের ব্যবস্থা করা যায় , তবে ছাত্রদের কাজের মাধ্যমে স্বতোৎসারিত ভাবে শৃঙ্খলা আসবে ।
নারীশিক্ষাঃ
তিনি ভারতবর্ষের নারীদের দুর্দশা দেখে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন । সমাজে নারীর অবমূল্যায়নের জন্য তিনি অশিক্ষাকে দায়ী করেছেন ।
তিনি বলেছেন , যে দেশ নারীকে শ্রদ্ধা করে না সেই দেশ বা জাতি কখনও বড়ো হতে পারে না ।
তিনি মেয়েদের জন্য গ্রামে গ্রামে পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করে তাদের মানুষ করতে বলেছেন । মেয়েরা মানুষ হলে তবেই ভবিষ্যতে তাদের সন্তান - সন্ততির দ্বারা দেশের মুখ উজ্জ্বল হবে । তিনি এজন্য একদল ব্রহ্মচারিণী গঠন করতে বলেছেন । যাঁরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মেয়েদের শিক্ষা দেবেন । তিনি নারীশিক্ষার একটি পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন । মহিলাদের আধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশের জন্য থাকবে নারী মঠ এবং থাকবে বিদ্যালয় । মেয়েদের শিক্ষা দেবে ব্রহ্মচারিণী অথবা শিক্ষিকা ।
তিনি বলেছেন , “ It is in the hands of education and pious mothers that great men are born . "
ভাষাশিক্ষা :
পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য বিবেকানন্দ ইংরেজি ভাষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও তিনি সংস্কৃত ভাষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন ।
ধর্মশিক্ষা :
বিবেকানন্দ ধর্মশিক্ষার পক্ষাপাতী ছিলেন কিন্তু ধর্মশিক্ষার নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় আচার - আচরণ নয় , সমস্ত ধর্মের মূলনীতি শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে হবে । ধর্মশিক্ষার জন্য তিনি রামায়ণ , মহাভারত , উপনিষদ থেকে ছোটো ছোটো নীতিগল্প অনুবাদ করে শিশু - শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কথা বলেছেন ।
কারিগরি শিক্ষা :
শিক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি শিক্ষার্থীকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য তিনি বৃত্তিমুখী শিক্ষার ওপরে গুরুত্ব দেন । এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হস্তশিল্প উৎপাদন করে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হবে । বিবেকানন্দ বলেছেন , “ কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পায়নের জন্য আর যা কিছু দরকার , সবই আমাদের চাই । যেন শুধু চাকরি না খুঁজে মানুষ নিজের ভরণ - পোষণ এবং ভবিষ্যৎ দুর্দিনের সময় ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট আয় করতে পারে । অবশ্য কারিগরি শিক্ষার সাথে তাত্ত্বিক মানবিক বিদ্যা এবং প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞানও থাকা দরকার ।
সুতরাং , স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা সম্পর্কে যাবতীয় ধ্যান ধারণা কখনো লিখিত প্রবন্ধে ও কখনো প্রকাশ্য বক্তৃতায় তুলে ধরেছেন ।
পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু বিবেকানন্দ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন " Rooted in the past of full of pride in India's heritage , Vivekananda was yet modern in his approach to life's problems , and was a kind of bridge between the past of India and her present . ” ( প্রাচ্যের ঐতিহ্যের মূলে জন্ম নিয়ে এবং ভারতের অতীত উত্তরাধিকারের গর্বে পূর্ণ হয়েও বিবেকানন্দ জীবন সমস্যার সমাধানে ছিলেন আধুনিক পথের দিশারি এবং তিনি ছিলেন ভারতের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একপ্রকার সেতুস্বরূপ ) ।
স্বামীজিকে স্মরণ করে আজও প্রতিবছর ১২ জানুয়ারি স্বামীজির জন্মদিনটি যুব দিবস কবে পালিত হয়। তার সম্বন্ধে উচ্চকণ্ঠে বলা যায়,"তোমার কণ্ঠস্বর ছিল সমুদ্র গর্জন এর মত, তুমি ছিলে আকাশের মত প্রকাশিত, মহমময় এবং মুক্ত "🙏🏻🙏🏻
যৌবনের দ্বারপ্রান্তে নরেন্দ্রকে আধ্যাত্মিক সংকটের সময় অতিক্রম করতে হয়েছিল যখন তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহের দ্বারা আতঙ্কিত হয়েছিলেন। 1881 সালের নভেম্বরে, নরেন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে দেখা করতে যান যিনি দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরে অবস্থান করছিলেন। নরেন্দ্র দক্ষিণেশ্বরে ঘন ঘন দর্শনার্থী হয়ে ওঠেন এবং শ্রী রামকৃষ্ণের নির্দেশনায় তিনি আধ্যাত্মিক পথে দ্রুত অগ্রসর হন।
কয়েক বছর পর দুটি ঘটনা ঘটে যা নরেন্দ্রকে যথেষ্ট কষ্ট দেয়, 1884 সালে তার পিতার আকস্মিক মৃত্যু এবং 1886 সালে শ্রী রামকৃষ্ণ। 1890 সালের মাঝামাঝি, বিবেকানন্দ বরানগর মঠ ত্যাগ করেন এবং ভারত অন্বেষণ ও আবিষ্কারের জন্য দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেন। তিনি দেশের মানুষের অবস্থা অধ্যয়ন করে সারা দেশে তীর্থযাত্রা করেছেন। তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই তাঁর চৌম্বক ব্যক্তিত্ব দারুণ ছাপ তৈরি করেছে।
তিনি পাশ্চাত্যে তাঁর বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্ব ধর্ম সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন যা 1893 সালে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তার প্রস্থানের প্রাক্কালে, তিনি স্বামী বিবেকানন্দের নাম গ্রহণ করেন। 1893 সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্মের সংসদে তার বক্তৃতা তাকে 'ঐশ্বরিক অধিকার দ্বারা বক্তা' এবং 'পশ্চিম বিশ্বের কাছে ভারতীয় জ্ঞানের বার্তাবাহক' হিসাবে বিখ্যাত করে তোলে। তিন বছর ধরে তিনি আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে বেদান্ত দর্শন ও ধর্ম প্রচার করেন এবং তারপর ভারতে ফিরে আসেন। 1897 সালের 1 মে তিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন খুঁজে পান। 1898 সালে তিনি বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠা করেন।
1899 সালের জুন মাসে তিনি পশ্চিমে দ্বিতীয় সফরের জন্য ভারত ত্যাগ করেন। তিনি 1900 সালের ডিসেম্বরে বেলুড় মঠে ফিরে আসেন। তাঁর বাকি জীবন ভারতে কাটিয়েছেন, মানুষকে অনুপ্রাণিত ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছেন অন্যদেরকে শুদ্ধ ও সত্য আধ্যাত্মিক পথে পরিচালিত করার জন্য। তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে এবং স্বামী বিবেকানন্দ 4 জুলাই 1902-এ বেলুড় মঠে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, শুধুমাত্র তাঁর সমসাময়িকদের হৃদয়ে নয়, পরবর্তী সমস্ত প্রজন্মের জন্য একটি অমর উত্তরাধিকার রেখে যান।
0 Comments