প্রধান ধর্মাধিকরণ বা সুপ্রিমকোর্ট (The Supreme Court)
In this article I will discuss those tropic 👇👇
সুপ্রিম কোর্টের গঠন, কার্যাবলী , অপসারণ, নিয়োগ, বেতন ,ভাতা আরো অন্যান্য বিষয়সমূহ
![]() |
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট || সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা || supreme Court of India |
বিভিন্ন দেশে বিচারব্যবস্থা সাধারণত দু-ধরনের হয়—(i) অখণ্ড বিচারব্যবস্থা এবং (ii) দ্বৈত বিচারব্যবস্থা। ভারতের বিচারব্যবস্থা অখণ্ড। অখণ্ড বিচারব্যবস্থা হওয়ার ফলে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এব সুপ্রিমকোর্ট, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত এবং সর্বোচ্চ আপিল আদালত। এই আদালত নতুন দিল্লিতে এক অবস্থিত। ভারতের অন্য সব আদালত প্রধান ধর্মাধিকরণ বা সুপ্রিমকোর্টের অধীনে। মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের এ মর্যাদা নেই, সেখানকার সুপ্রিমকোর্ট শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত, রাজ্যগুলির জন্য পৃথক পৃথক সুপ্রিমকোর্ট আছে। সুপ্রিমকোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি ছিলেন স্যার এইচ. জে. কানিয়া। বর্তমানে এই দায়িত্ব গ্রহণ ক করেছেন এন. ভি. রমনা।
কার্যকাল
সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের কার্যকাল 65 বছর বয়স পর্যন্ত। এর আগে তাঁরা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে বা মৃত্যু হলে পদ শূন্য হয়। 7
অপসারণ
সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ব্যবস্থাও আছে। সংবিধানের 124 (4) নম্বর ধারা অনুসারে হি কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে একমাত্র অসদাচরণ ও অসামর্থ্যের অভিযোগ উঠলে, রাষ্ট্রপতি অভিযুক্ত বিচারপতিকে পদচ্যুত করতে পারেন। তবে এটা রাষ্ট্রপতির ইচ্ছানুসারে হয় না। পার্লামেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্দিষ্ট পদ্ধতির দ্বারা করা হয়। প্রথমে অপসারণ প্রস্তাবটি পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে উপস্থাপন করতে হয়, তারপর প্রতি কক্ষের মোট সদস্যের অধিকাংশ এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যের 2/3 অংশ সমর্থন করলে, রাষ্ট্রপতি বিচারপতিকে অপসারণ করতে পারেন। তার আগে অভিযুক্ত বিচারপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হয়। একে ইমপিচমেন্ট পদ্ধতি বলা হয়।
এর প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য, আজ পর্যন্ত ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারপতিকে পদচ্যুত করা হয়নি। পরিস্থিতিতে কেউ কেউ পদত্যাগ করেছেন।
বেতন, ভাতা
ভারতের বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য সুপ্রিমকোর্ট ও ঠুকোর্টের বিচারপতিদের বেতন, ভাতা প্রভৃতি ‘সঞ্ঝিত তহবিল’ কে দেওয়া হয়। এই ব্যয়ের জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন
বর্তমানে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেতন 2 লক্ষ ৪০ হাজার কা এবং অন্যান্য বিচারপতির বেতন 2 লক্ষ 50 হাজার টাকা। তা ছাড়া ন্যান্য ভাতা ও বিভিন্ন প্রকার সুযোগসুবিধা তাঁদের দেওয়া হয়ে কে। সাধারণত বিচারপতিদের বেতন, ভাতা ইত্যাদি নিয়োগ হয়ে ওয়ার পর আর কমানো যায় না। তবে আর্থিক জরুরি অবস্থা জারি লে রাষ্ট্রপতি বিচারপতিদের বেতন, ভাতা প্রভৃতি কমাতে পারেন। বসরের পর বিচারপতিগণ পেনশন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা পেয়ে কেন। অবসরের পর সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারপতি কোনো আদালতে ওকালতি করতে পারেন না। এন. ভি. রমনা
বিচারপতিদের সংখ্যা
সংবিধানের 124–147নং ধারায় সুপ্রিমকোর্ট সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমানে সুপ্রিমকোর্ট 3 জন বিচারপতি এবং 1 জন প্রধান বিচারপতি অর্থাৎ, মোট 34 জন বিচারপতি নিয়ে গঠিত হয়। 1986 ইস্টাব্দ থেকে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রাথমিক পর্বে অর্থাৎ, 1956 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত 1 জন প্রধান বিচারপতি এবং অনধিক 7 জন বিচারপতি নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট গঠিত হত।
সুপ্রিমকোর্টে বিচারপতির সংখ্যা সম্পর্কে সংবিধানে কিছু বলা হয়নি। শুধু নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পার্লামেন্ট আইন করে বিচারপতির সংখ্যা নির্ধারণ করবে। তাই বারবার প্রয়োজনমতো আইন করে বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রয়োজনে অস্থায়ী বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থাও আছে।
সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারপতিগণ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন। একবার নিযুক্ত হলে 65 বছর বয়স পর্যন্ত তাঁরা স্বপদে বহাল থাকেন। অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগের সময় রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করেন। তবে বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। সংবিধানে না থাকলেও, সংসদীয় গণতন্ত্রে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার যে, সব বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ-অপছন্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে বিচারপতি নিয়োগের সময় রাষ্ট্রপতি দুটি প্রথা মেনে চলেন। যথা—প্রবীণতার নীতি (Seniority) চলেন এবং সুপ্রিমকোর্টের মোট বিচারপতির মধ্যে অন্তত একজন মুসলিম বিচারপতি সর্বদাই যাতে থাকেন, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকেন। অবশ্য প্রথা ভাঙার নজির যে ভারতে নেই, তা নয়। তবে সেগুলিকে ব্যতিক্রম বলাই ভালো।
নিয়োগ
সব দেশেই সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের জন্য কিছু যোগ্যতা নির্দিষ্ট করা থাকে, অনুরূপভাবে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের জন্য কিছু যোগ্যতা 124(3)নং ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি হিসেবে রাষ্ট্রপতি যাঁদের নিয়োগ করবেন,
যোগ্যতা
তাঁদের কমপক্ষে উল্লেখিত যোগ্যতাগুলি থাকা দরকার। যথা—
(i) ভারতীয় নাগরিকতা,
(ii) কমপক্ষে 5 বছর কোনো হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা, অথবা
(iii) একটানা 10 বছর কোনো হাইকোর্টে ওকালতির অভিজ্ঞতা,
অথবা
(iv) রাষ্ট্রপতির মতে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ (Distinguished Jurist) হতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে দ ও যোগ্য করে তোলার জন্য এসব যোগ্যতাবলিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কার্যাবলি
ভারতে প্রতিষ্ঠিত অখণ্ড বিচারব্যবস্থার জন্য সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা, কার্যাবলি বা এক্তিয়ার ব্যাপক আকা ধারণ করেছে। কারণ, মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের মতো ভারতের সুপ্রিমকোর্ট তো শুধু যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত নয় সমগ্র দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত।
ভারতের সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতাগুলিকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—
(1) মূল এলাকা
(2) আপিল এলাকা,
(3) পরামর্শ দান এলাকা এবং
(4) নির্দেশ, আদেশ ও লেখ জারির ক্ষমতা।
1. মূল এলাকা (Original Jurisdiction) : সংবিধানের 131 নং ধারায় সুপ্রিমকোর্টের মূ এলাকার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মূল এলাকায় সুপ্রিমকোর্ট যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালতের কিছু নির্দিষ্ট দায়ি পালন করে। সুপ্রিমকোর্টের মূল এলাকার মামলাগুলি অন্য কোনো আদালতে করা যায় না।
মূল এলাকার প্রথম বিষয় হল আইনগত অধিকার সংক্রান্ত, যথা—
(a) কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এক বা একাধিক রাজ্য সরকারের বিরোধ দেখা দিলে।
(b) একদিকে কেন্দ্রীয় সরকার ও এক বা একাধিক রাজ্য সরকারের সঙ্গে এক বা একাধিক রাজ্য সরকারে মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে।
(c) দুটি রাজ্য সরকারের একমাত্র সুপ্রিমকোর্টেই তার মীমাংসা হয়। এক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্ট সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দিয়ে থা এই মূল এলাকার পরিপ্রেক্ষিতেই বলা হয় যে, সুপ্রিমকোর্ট সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকর্তা ও অভিভাবসুল সংবিধানের 71(1) নং ধারা অনুযায়ী, মূল এলাকার আরও একটি বিষয় হল রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা। এই মামলা বা বিরোধের নিষ্পত্তি সুপ্রিমকোর্টেই হয়ে থাকে।
মধ্যে বা ততোধিক রাজ্য সরকারের পরস্পরের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে
সীমাবদ্ধতা : সুপ্রিমকোর্টের মূল এলাকার কিছু ব্যতিক্রম বা সীমাবদ্ধতা সংবিধানে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলি হল—সংবিধান চালু হওয়ার আগে যেসব সন্ধি, চুক্তি, অঙ্গীকার পত্র, সনদ প্রভৃতি প্রবর্তিত হয়েছি। বা সম্পাদিত হয়েছিল এবং সংবিধান চালু হওয়ার পরও কার্যকর আছে, সেইসব বিষয়ে বিচারের অধিকার সুপ্রিমকোর্টের নেই। আবার যদি কোনো সন্ধি, চুক্তি, সনদে উল্লেখ থাকে যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টে মামলা করা যাবে না, তাহলে সেগুলির মামলাও সুপ্রিমকোর্টের মূল এলাকার মধ্যে পড়ে না। তা ছাড়া কোনে নাগরিকের সঙ্গে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের মামলা মূল এলাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না।
সুপ্রিমকোর্টের মূল এলাকার প্রথম মামলাটি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার বনাম কেন্দ্রীয় সরকারের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বক্তব্য ছিল, কেন্দ্রীয় সরকার আইন করে পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্গত কয়লাখনিগুলি অধিগ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষেই রায় দেয়
2. আপিল এলাকা (Appellate Jurisdiction) : ভারতে অখণ্ড বিচারব্যবস্থা থাকার ফলে সুপ্রিমকোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালতের মর্যাদার অধিকারী হয়েছে। নিম্ন আদালতের অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায়। সুপ্রিমকোর্টের আপিল এলাকা চারটি ভাগে বিভক্ত। যথা— (a) সংবিধানের ব্যাখ্যা বিষয়ে আপিল, (b) দেওয়ানি আপিল, (c) ফৌজদারি আপিল এবং (d) বিশেষ অনুমতির আপিল।
(a) সংবিধানের ব্যাখ্যা বিষয়ে আপিল : সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকর্তা সুপ্রিমকোর্ট। তাই ফৌজদারি, দেওয়ানি বা যে-কোনো মামলার রায় দেওয়ার সময় যদি নিম্ন আদালত ঘোষণা করে যে, মামলাটির সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যার বিষয় জড়িত আছে, তাহলে 132 (1) নং ধারা অনুসারে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায়। হাইকোর্ট এই ধরনের সার্টিফিকেট না দিলেও সুপ্রিমকোর্ট যদি মনে করে, সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে, তাহলে আপিল করার বিশেষ অনুমতি দিতে পারে। মামলাটির
(b) দেওয়ানি আপিল : বর্তমানে দুটি দেওয়ানি বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায়—(i) যদি হাইকোর্ট এই মর্মে সার্টিফিকেট প্রদান করে যে, মামলাটির সঙ্গে আইনের গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ প্রশ্ন জড়িত আছে (Substantial question of Law of general importance) এবং (ii) 133(1) নম্বর ধারা অনুসারে হাইকোর্ট যদি মনে করে সংশ্লিষ্ট মামলাটি সুপ্রিমকোর্টে হওয়া উচিত, তাহলে উক্ত মামলাটি সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা হয়।
বিচারবিভাগ
(c) ফৌজদারি আপিল : 134 নং ধারা অনুসারে ফৌজদারি বিষয়ে সাধারণত তিনটি ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা যায়। যথা—(i) কোনো অধস্তন আদালতের রায়ে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে হাইকোর্ট যদি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। (ii) অধস্তন আদালতে বিচার চলছে এমন কোনো মামলাকে নিজের কোর্টে এনে হাইকোর্ট যদি অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। (iii) কোনো মামলাকে সুপ্রিমকোর্টে আপিলযোগ্য বলে হাইকোর্ট সার্টিফিকেট দিলে। 134(2) নং ধারা অনুসারে, পার্লামেন্ট আইন করে সুপ্রিমকোর্টের আপিল গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে।
(d) বিশেষ অনুমতির আপিল : সংবিধানের 136(1) নং ধারা সুপ্রিমকোর্টকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, তার দ্বারা ভারতের যে-কোনো আদালত, ট্রাইবিউনাল প্রভৃতির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার বিশেষ অনুমতি সুপ্রিমকোর্ট দিতে পারে। একে বিশেষ অনুমতি বা ‘Special leave’ বলে। আলোচ্য বিষয়ে উল্লেখযোগ্য মামলা হল, ভারত ব্যাংক বনাম ভারত ব্যাংক কর্মচারীবৃন্দ, দুর্গাশংকর বনাম রঘুনাথ সিং প্রভৃতি।
তবে আলোচ্য বিষয়ে 136(2) নং ধারায় ব্যতিক্রমের কথা বলা আছে। এই ধারা অনুসারে কোনো সামরিক আদালত বা সামরিক ট্রাইবিউনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্ট আপিল করার বিশেষ অনুমতি দিতে পারে না।
3. পরামর্শ দান এলাকা (Advisory Jurisdiction) : মার্কিন সুপ্রিমকোর্ট, অস্ট্রেলিয়ার সুপ্রিমকোর্ট প্রভৃতি অপেক্ষা যে বিষয়ে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা বেশি, তা হল পরামর্শ দান এলাকা। সুপ্রিমকোর্টের কাছে দুটি ক্ষেত্রে ভারতের রাষ্ট্রপতি পরামর্শ চাইতে পারেন।
(a) আইনগত বা তথ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সকলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ এমন কোনো প্রশ্ন যদি দেখা দেয়, যা থেকে সমস্যা হয়েছে বা হতে পারে, এমন বিষয়ে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের কাছে পরামর্শ চাইতে পারেন [143(1) নম্বর ধারা অনুযায়ী]। সুপ্রিমকোর্ট এই পরামর্শ দিতে পারে বা নাও দিতে পারে। আবার রাষ্ট্রপতি | সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ গ্রহণ বা বর্জনও করতে পারেন।
(b) সংবিধান চালু হওয়ার আগে হয়েছে এমন চুক্তি, সনদ, অঙ্গীকার পত্র যা সংবিধান চালু হওয়ার পরও কার্যকরী আছে, এমন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো বিরোধ বা সমস্যা দেখা দিলে 143(2) নং ধারা অনুসারে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের কাছে পরামর্শ চাইতে পারেন। এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্ট পরামর্শ দিতে বাধ্য। তবে রাষ্ট্রপতি সেই পরামর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য নন। অবশ্য অভিজ্ঞতার দ্বারা বলা যায় যে, সাধারণত রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ আদালতের জম্মু-ক [-কাশ্মীরে পরামর্শ গ্রহণ করেই থাকেন। উদাহরণ হিসেবে গুজরাট বিধানসভা ভাঙা অবস্থায় নির্বাচন, পুনর্বাসন বিল প্রভৃতি বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেছিলেন।
4. নির্দেশ, আদেশ ও লেখ জারির ক্ষমতা (Directions, Orders and Writs) : সুপ্রিমকোর্টকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের রক্ষাকর্তা বলা হয়। সংবিধানে সংরক্ষিত মৌলিক অধিকারগুলি (14–32 ন ধারা) সংরক্ষণের জন্য জনগণ সুপ্রিমকোর্টের কাছে আবেদন জানাতে পারে। তার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিমকো পাঁচ প্রকার লেখ জারি করতে পারে। যথা—
(i) বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ (Habeas Corpus); (ii) পরমাদেশ (Mandamus); (iii) প্রতিষেধক (Prohibition); (iv) অধিকার-পৃচ্ছা (Quo-Warranto); (v) উৎপ্রেষণ (Certiorari)। বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ (Habeas Corpus)
সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকারে যেমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ 32 নং ধারা, তেমনি 32 নম্বর ধ উল্লিখিত পাঁচটি লেখ-এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও পরিচিত লেখ হল বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ বা হেলি
করপাস। এটি লাতিন শব্দ ‘-এর ইংরেজি রূপান্তর। এর অর্থ You shall have the body। এর অভিধানগত অর্থ ‘সশরীরে হাজির করা।’
বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ লেখ জারি করে সুপ্রিমকোর্ট আটক কোনো ব্যক্তিকে আদালতে সশরীরে হাজির করার আদেশ দিতে পারে এবং যদি দেখা যায় উক্ত ব্যক্তিকে আইন অনুসারে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি তাহলে আদালত তাকে মুক্তি দিতে পারে। সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট এই লেখ জারি করতে পারে। তবে সুপ্রিমকোর্ট শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এবং হাইকোর্ট রাষ্ট্র ও ব্যক্তি উভয়ের ক্ষেত্রে এই লেখ জারি করতে পারে। এই লেখটির উদ্দেশ্য হল যাতে অন্যায় বা বেআইনিভাবে কেউ কোনো ব্যক্তিকে আটক করতে না পারে। কারণ অনেক সময় সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বহু ব্যক্তিকে আটক করে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। তা ছাড়া কোনো সময়ে দেখা যায় যে পুলিশ আটক ব্যক্তিকে গুম করে দেয় বা পুলিশের অত্যাচারে আটক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সেক্ষেত্রে বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ রহস্য উদ্ঘাটনে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে ভিখারি পাসোয়ান মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের লেখ জারি উল্লেখযোগ্য।
বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ বিষয়ে কিছু ব্যতিক্রম আছে যা সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। (a) আদালতের এক্তিয়ার (Jurisdiction) নেই এমন ক্ষেত্রে অর্থাৎ আদালতের এক্তিয়ারের বাইরে যদি কাউকে গ্রেফতার বা আটক করা হয় সেক্ষেত্রে এই লেখ জারি করা যাবে না। (b) ফৌজদারি মামলায় যদি কোনো ব্যক্তির শাস্তিস্বরূপ কারাবাস হয় তাহলে তার ক্ষেত্রে এই লেখ জারি করা যায় না। পরমাদেশ (Mandamus)
এটিও লাতিন শব্দ mandamus হল ইংরেজি রূপ। পরমাদেশ বা Mandamus-এর অর্থ We Order বা ‘আমরা আদেশ করছি’। পরমাদেশ জারি করে আদালত, সরকার, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা যে-কোনো কর্তৃপক্ষকে তার কর্তব্য পালনের জন্য নির্দেশ দিতে পারে। অবশ্য রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালের ওপর পরমাদেশ প্রযোজ্য নয়।
প্রতিষেধ (Prohibition)
সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকারে 32 নং ধারায় উল্লিখিত অন্যান্য লেখগুলির সঙ্গে প্রতিষেধের একটু পার্থক্য আছে। এই লেখটি কেবলমাত্র বিচারবিষয়ক বা আধা বিচার বিষয়ের (Quasi-Judicial) ক্ষেত্রে জারি করা যায়, আইনবিষয়ক ক্ষেত্রে এই লেখ জারি করা যায় না।
প্রতিষেধের সহজ অর্থ নিষেধ করা। মূল লাতিন শব্দটি হচ্ছে ‘Prou i bi shan'। প্রতিষেধ জারি করে উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতকে নিজ এক্তিয়ার অতিক্রম না করতে এবং ন্যায় বিরোধী কোনো কাজ না করতে নির্দেশ করতে পারে।
অধিকার-পৃচ্ছা (Quo-Warranto)
অধিকার-পৃচ্ছা একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখ। এই লেখ-এর মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট কোনো ব্যক্তির কাছে জানতে চায় কোন্ অধিকারে সে স্বপদে আসীন আছে। অর্থাৎ কোনো সরকারি পদাধিকারী বৈধভাবে কোনো পদে নিযুক্ত না হয়েও সেই পদ অধিকার করে থাকলে বা দাবি করলে তখন তাঁর বিরুদ্ধে এই লেখ জারি করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি বৈধ না হলে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ্য বিষয় হল যে একমাত্র সরকারি ক্ষেত্রেই এই লেখ জারি করা যায়।
উৎপ্রেষণ (Certiorari)
এই লেখ-এর সাহায্যে সুপ্রিমকোর্ট বা হাইকোর্ট কোনো আদালতের মামলা সেই কোর্ট থেকে তুলে উচ্চতর আদালতে অর্পণ করতে পারে এবং ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হয়েছে এমন আদেশ বাতিল করতে পারে। সাধারণত কোনো আদালত তার এক্তিয়ার অতিক্রম করলে বা আদালতের ক্ষমতার অপব্যবহার করলে
উৎপ্রেষণ জারি করে মামলাটি উচ্চতর আদালতে স্থানান্তরিত করা হয়। এ ছাড়া আদালতের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কোনো রায় বা আদেশ দিলে তাও এই লেখ-এর মাধ্যমে বাতিল করা যায়।
33 নম্বর ধারা : সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার ভারতের নাগরিকগণ সমানভাবে ভোগ করতে পারে না। 33 নং ধারায় অন্যান্য মৌলিক অধিকার ও বিশেষ করে সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার সীমিতকরণের ক্ষমতা পার্লামেন্টকে দেওয়া হয়েছে। 33 নং ধারায় বলা হয়েছে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য, সরকারি সম্পত্তি ও জন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের কর্তব্যপালনের ক্ষেত্রে কতটা সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার ভোগ করতে পারবে তা পার্লামেন্ট আইন করে ঠিক করে দেবে। 50তম সংবিধান সংশোধন করে রক্ষীবাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দাবাহিনী, টেলিযোগাযোগের কর্মীদের ক্ষেত্রেও 33নং ধারা প্রযোজ্য হবে বলা হয়েছে।
I 34 নম্বর ধারা : 34 নং ধারায় বলা হয়েছে ভারতের কোনো অংশে সামরিক আইন বলবৎ থাকলে বা রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাজে কর্মরত কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট অংশে শৃঙ্খলা রক্ষা বা শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কোনো অবৈধ কাজ করলেও তাকে বৈধ বলে পার্লামেন্ট আইন তৈরি করতে পারবে। # 35 নম্বর ধারা : 35 নং ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে সংসদকে কিছু বিষয়ে আইন প্রণয়ন ও শাস্তি বিধানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। 35 নং ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পার্লামেন্ট 16(3), 32 (3), 33 ও 34 নং ধারার যে-কোনো বিষয়ে আইন করা এবং ওই আইনের দ্বারা সংবিধানের তৃতীয় অংশে বর্ণিত কোনো অপরাধের জন্য শাস্তি দিতে পারবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা থাকাকালীন সময়ে বিশেষ আদেশ দ্বারা | সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকারের প্রয়োগ বন্ধ রাখতে পারেন।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকারের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কয়েকটি মন্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। ড. বি. আর. আম্বেদকর ভারতের গণপরিষদে বলেছিলেন, “আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে সংবিধানের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ধারা কোন্টি, যেটি ছাড়া সংবিধান অর্থহীন? আমি এই ধারাটি (সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার) ছাড়া অন্য কিছু বলব না।”
আলোচ্য ক্ষমতাটির দ্বারা সুপ্রিমকোর্ট গণতন্ত্র রক্ষা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এক ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।
অবশ্য মৌলিক অধিকার রক্ষা ছাড়া পার্লামেন্ট আইন করে অন্যান্য বিষয়ে লেখ ও নির্দেশ জারি করার ক্ষমতা সুপ্রিমকোর্টকে দিতে পারে।
অভিলেখ আদালত (Court of Records)
সংবিধানের 129 নম্বর ধারা মতে, সুপ্রিমকোর্ট অভিলেখ আদালত। তাই এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা ও মর্যাদার সঙ্গে দুটি বিষয় জড়িত। একটি হল (1) সুপ্রিমকোর্টে সংরক্ষিত সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রভৃতি নথিপত্র ভারতের যে-কোনো আদালতে বা কর্তৃপক্ষের কাছে যথার্থ ও চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। অপর বিষয়টি হল (2) অভিলেখ আদালত হিসেবে সুপ্রিমকোর্ট তার অবমাননার জন্য যে-কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারে।
অন্যান্য ক্ষমতা
সুপ্রিমকোর্টের অন্যান্য ক্ষমতার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল (1) নিজের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনা করা। অতীতে দেওয়া সুপ্রিমকোর্টের যে-কোনো রায় যুক্তিসংগত কারণে পরবর্তীকালে সুপ্রিমকোর্ট পুনর্বিবেচনা করে নতুন করে রায় দিতে পারে। পূর্বের দেওয়া রায় পরবর্তীকালে পুনর্বিবেচনা করে সংশোধন করেছে এমন মামলার উদাহরণ হিসেবে শংকরীপ্রসাদ মামলা, সজ্জন সিং মামলা, গোলকনাথ মামলা, কেশবানন্দ ভারতী মামলা প্রভৃতির কথা বলা যায়। (2) নিজ কাজের জন্য কর্মচারী নিয়োগ। (3) রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করানো প্রভৃতিও সুপ্রিমকোর্টের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

0 Comments