![]() |
| বাংলার উৎসব //প্রবন্ধ রচনা |
উৎসবময়তা বাংলার ঐতিহ্য—বাঙালির বৈশিষ্ট্য। উৎসবের এই অনাবিল আনন্দস্রোতে অবগাহন করে বাঙালি বার বার তার দুঃখ, বেদনা, জ্বালা, যন্ত্রণা ভুলে যায়—ভুলে থাকে। এই বাংলার বুকে প্রকৃতির অপরিসীম ও অকৃপণ দান বাঙালির চিত্তজগৎকে প্রসারিত করেছে, তার হৃদয়কে উৎসব মুখরিত করে তুলেছে। ফুল ও ফসলের সম্ভার নিয়ে বঙ্গজননী দাঁড়িয়ে আছে—নদী বয়ে চলেছে, বুকে তার পলি মধু সৃষ্টির যাদু, যার স্পর্শে গড়ে ওঠে বাংলার শস্যভাণ্ডার। মাঠের বিরাট কড়াতে চাষিরা সূর্যের তাপে বৃষ্টির জলে নানা সব্জি, ফল ও ধান রাশি রাশি রান্না করে চলেছে বারো মাস।
এই উদার উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে লালিত-পালিত হয়ে সেই কবে থেকে বাংলার জনমানসে নানা ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়কে কেন্দ্র করে উৎসবের যে জোয়ার বয়ে যেতে শুরু করেছিল আজও তা নানা বাধা-বিঘ্নকে অতিক্রম করে আপন মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছে—বাঙালি জীবনের মূল উপজীব্য বারো মাসে তের পার্বণ।
উৎসব বাঙালিকে প্রাণ দিয়েছে, দিয়েছে স্ফূর্তি। নবীন উন্মাদনায়, সংস্কৃতির চর্চায় সে উৎসব পালন করে চলেছে। জীবনের গ্লানি, কলুষতা ধুয়ে দিয়েছে উৎসবের স্পর্শে। ভ্রাতৃভাবে আবদ্ধ করেছে উৎসব, তার আন্তরিকতা বাঙালির হৃদয়কে প্রসারতা দিয়েছে।
বিবাহ, উপনয়ন, অন্নপ্রাশন, জামাইষষ্ঠী প্রভৃতি সমাজকেন্দ্রিক উৎসব। এই জাতীয় উৎসবে সমাজকে একটা বিধিবদ্ধ বাঁধনের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। উৎসবের এই বাঁধনগুলো না থাকলে আমাদের সমাজের পরিকাঠামো ঠিক থাকতো না। বাংলা সংস্কৃতি ও কৃষ্টিপ্রধান দেশ। বিভিন্ন সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে আরো কতো এইরূপ সামাজিক উৎসব প্রচলিত আছে তা বলে শেষ করা যায় না। এছাড়া আরো কতগুলি উৎসব আছে সারা বছর ধরে বিভিন্ন সময় পালিত হয় – যেমন, দোল উৎসব, মাঘোৎসব, ভাদু, টুসু উৎসব। গাজনের মেলা, রথের মেলা, চণ্ডী মেলা—এই সব উৎসব লোক-উৎসবের মধ্যে পড়ে। এই উৎসবগুলির মধ্যে বাংলার জনমানসের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়। সামাজিকতাকে, পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এ ধরনের উৎসবের জুড়ি নেই। ঐতিহ্যের প্রতি সম্মানবোধ, পারিবারিক রীতির প্রতি আস্থা জেগে ওঠে এভাবে।
ধর্মপ্রাণ বাঙালি ধর্মের নানা দিককে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ঋতুতে নানা উৎসবে মেতে উঠেছে। উৎসবের সূচনা পর্বে ধর্মের নানা গোঁড়ামি থাকলেও মূল্যবোধজনিত নবজাগরণ ও নবচেতনার যুগ থেকে এই গোঁড়ামির ভয়াবহতা ক্রমে অপসৃত হতে থাকে। এখন এই উৎসব ও ধর্ম মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে গেছে।
এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে আছে—দুর্গাপূজা, কালীপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, বাসন্তী পূজা, কার্তিক পূজা, লক্ষ্মী পূজা, রামনবমী, এছাড়া বিভিন্ন অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় অঞ্চলভিত্তিক নানা দেবদেবীর আরাধনা। শ্রাবণের সংক্রান্তিতে মনসা পূজা বিশেষ অঞ্চলের পূজা হলেও এখন তা প্রায় সর্বত্র প্রচলিত। বিশ্বকর্মা পূজা বিশেষ আড়ম্বর সহকারে বাংলার সর্বত্র অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার জনমানসে দেবদেবীর প্রভাব যথেষ্ট থাকার দরুন সমগ্র বাংলা জুড়ে বছরের কোনো না কোনো দেব-দেবীর পূজা লেগেই থাকে। বিশ্বকর্মা পূজার দিন অনেক স্থানে মনসা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই ভাবে দেখা যায় বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে নানা আঞ্চলিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেব-দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
ধর্মীয় আচারগুলি অনুশীলিত হয় এভাবেই। নবীন প্রজন্মের কাছে পুরাতন ভাবধারার অভিঘাত এসে পৌঁছয় এর মাধ্যমে। পৌরাণিক চেতনা, ধর্মীয় বাতাবরণে মানুষের চিত্তশুদ্ধি ঘটে। সমাজের সংবন্ধন মজবুত ভিত্তি পায়। দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে শ্রেষ্ঠ উৎসব। ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে এ উৎসবে মেতে ওঠে। মিলনের বার্তা, সম্প্রীতির মন্ত্র এখানে উচ্চারিত হয়। প্রকৃতির উৎসবের প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
অনুপমশোভার সাথে এরপর আসা যাক জাতীয় উৎসবের কথায়। জাতির জীবনে যে সব ঘটনা বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে, সমন্বয় ও সংহতির সুরে সমগ্র জাতিকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে সেই সকল ঘটনাবলী মর্যাদা-ধন্য করে রাখবার জন্য যে উৎসব অনুষ্ঠিত হয়—তাই জাতীয় উৎসব। যেমন, ১৫ আগস্টে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়, ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয়। স্বাদেশিকতা, দেশপ্রেম, জাত্যভিমান সঞ্চারিত হয় এ উৎসবের মাধ্যমে ভারতবাসী নিজেকে একই দেশের, একই মাতৃভূমির অংশীদার বলে মনে করতে পারে।
আজকের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কুৎসা, কলুষতার মাঝে উৎসবগুলি আমাদের প্রাণ সঞ্চার করে চলেছে। সমাজ, ব্যক্তি, দেশ সকলেই পুষ্ট ও সমৃদ্ধ হচ্ছে উৎসবের দ্বারা। প্রীতি, সমন্বয়, সংহতি, সংবেদনশীলতা জেগে ওঠার মধ্যেই উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা নিহিত

0 Comments