“আমি চাই এমন লোক—যাহাদের শরীরের পেশিসমূহ লৌহের ন্যায় দৃঢ় ও স্নায়ু ইস্পাতনির্মিত হইবে, আর তাহাদের শরীরের ভিতর এমন একটি মন বাস করিবে, যাহা বজ্রের উপাদানে গঠিত।”—স্বামী বিবেকানন্দের এই আশা ছিল ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের উদ্দেশ্যে। বর্তমান ছাত্রসমাজেই ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, যাদের মধ্যে আমরা হয়তো ভবিষ্যতে পাব কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানী, বিশ্ববরেণ্য দেশনেতা, কোনো সেবাব্রতে নিষ্ঠাবান চিকিৎসক প্রভৃতি।
কারণ আমরা জানি— “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।” আর বজ্রকঠিন শরীর ও ব্রষ্মতেজ-সমন্বিত চরিত্র গড়ে তুলতে ছাত্রসমাজে খেলাধুলার প্রতি বিশেষ মনোযোগ ও গুরুত্ব প্রদান প্রয়োজন।
বাল্য ও কৈশোর পর্বই চরিত্র-মানস গঠনের শ্রেষ্ঠ কাল; কারণ পরিণতবয়স্করা খানিকটা অবসর যাপনের উদ্দেশ্যে, খানিকটা তাদের জীবনে বৈচিত্র্য আনার জন্য খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করলেও তাদের বয়সে চরিত্র ও মানস গঠন পূর্বেই সংঘটিত হয়ে যায়। তাই ছাত্রসমাজেই খেলাধুলার প্রভাব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘Health is wealth’ শুধুমাত্র কেতাবী কথা নয়, এটা চিরকালীন বাস্তব সত্য।
শিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলার গভীর সম্পর্ক, যেসকল ছাত্রছাত্রীর মনে শিক্ষার প্রতি একধরনের ভীতি কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রে খেলাচ্ছলে পড়াশুনা অনেক বেশি ফলপ্রদ হয়। মনোবিজ্ঞানীগণ শিক্ষাক্ষেত্রে খেলাচ্ছলে শিক্ষাদানকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। শুধু তাই নয়, খেলাধুলার ফলে শরীর সুস্থ থাকে, ফলে মনও ভালো থাকে যা বিদ্যার্জনের পক্ষে সহায়ক।
কারণ, শিক্ষায় মনের স্বতঃস্ফূর্ততা বিশেষ প্রয়োজন। ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে শরীর সুস্থ ও সবল থাকলেই মনের স্ফূর্তি বজায় থাকে। ‘Healthy mind in a healthy body. কোনো ছাত্র যদি গ্রন্থকীটের ন্যায় সারাক্ষণ পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে নিজেকে নিযুক্ত রাখে, তবে হয়তো কোনো একদিন সে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে অধ্যয়নের নিয়মানুবর্তিতার মাঝে, খেলার মাঠের ক্ষণেকের আনন্দ তাকে সতেজ ও স্বতঃস্ফূর্ত করতে পারে। খেলাধুলার এই প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা ছাড়া ছাত্রসমাজে এর আরও কিছু প্রয়োজনীয়তা আছে।
নিয়মিত খেলাধুলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে মন খানিকটা বহির্মুখী হবার সুযোগ পায়। বাইরের প্রকৃতি, খোলা আলো-হাওয়া, কর্মচাঞ্চল্য প্রভৃতি তাদের মনকে কর্মমুখী, স্বচ্ছহৃদয় ও উদার করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। খেলার মাঠে, যেকোনো রকম খেলাধুলায় শৃঙ্খলা-রক্ষা করা অন্যতম কৃত্য। দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়ম-শৃঙ্খলা পালনের মাধ্যমে চরিত্র-মানস-স্বভাব গঠনে একটা সুশৃঙ্খল অভ্যাস আপনা-আপনি গড়ে ওঠে।
এছাড়া অন্যান্যদের অভিমত ও কাজকর্মকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা অর্জিত হয়, ফলে, গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। নেতাকে মান্য করা ও কখনো প্রয়োজনে নেতৃত্বদানের যোগ্যতাও অর্জিত হয়। অনুশীলন ও সাধনার ফলে যে সাফল্য আসে—খেলার মাঠে অর্জিত এই শিক্ষা, ছাত্রদের বিদ্যার্জনে ও জীবনে সর্বক্ষেত্রে সাফল্য লাভে সাহায্য করে। ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়, বুদ্ধিবৃত্তিরও বিকাশ ঘটে। খেলার মাঠে ঐক্যবদ্ধভাবে খেলার ফলে ঐক্যবোধের জাগরণ ঘটে; কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ‘Unity is strength’ এই উপলব্ধিটির উৎপত্তি হয়।
যদিও একথা সত্য ছাত্রদের অধ্যয়নই তপস্যা, তবুও অধ্যয়নের পাশে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তাছাড়া, স্বাস্থ্যবান নাগরিক যেকোনো জাতি বা দেশের পক্ষে মূল্যবান সম্পদ বিশেষ।
পাশে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। খেলাধুলা ও পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে পারলেই ছাত্রসমাজ তাদের ভবিষ্যতে সুন্দর জীবনের অধিকারী হয়ে উঠবে। শিক্ষালয়ে, পাঠ্যসূচিতে খেলাধুলার বিষয়টির অন্তর্ভুক্তিও ঘটেছে সরকারি প্রচেষ্টায়।
সেই সঙ্গে যদি শিক্ষালয়গুলির পক্ষ থেকে কোনো প্রকার খেলায় অংশগ্রহণ করা হয়, তবে তা ছাত্রদের পক্ষে যেমন আনন্দদায়ক গৌরবের বিষয়, তেমনই সেই বিদ্যালয়ের পক্ষেও এক বিশেষ গৌরবের বিষয়। সুতরাং, শিক্ষক-শিক্ষিকা বা অভিভাবক-অভিভাবিকার বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে কোনো ছাত্রছাত্রী স্বাস্থ্যহীন গ্রন্থকীটে পরিণত না হয়; কারণ, শৈশবের স্বাস্থ্যহীনতাই তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তাছাড়া স্বাস্থ্যবান নাগরিক যে কোন জাতি বা দেশের পক্ষে মূল্যবান সম্পদ বিশেষ।
0 Comments