গ্রাম পঞ্চায়েত (Gram Panchayat) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা
আজকের আর্টিকেল টির মাধ্যমে আমরা আলোচনা করছি,
গ্রাম পঞ্চায়েতের কার্যাবলী,গঠন, নির্বাচন, প্রার্থীদের যোগ্যতা অযোগ্যতা,
কার্যকাল, পদত্যাগ ,পদচ্যুতি ,
উপসমিতি , প্রধান উপপ্রধান নির্বাচন,
প্রধানের কার্যাবলী, পঞ্চায়েতের এর কার্যাবলী,
অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ,অর্পিত কর্তব্য, স্বেচ্ছাধীন কাজ,
অন্যান্য ক্ষমতা ,ব্যাপক ক্ষমতা ,গ্রাম পঞ্চায়েতের কর্মসূচি ও অন্যান্য কর্মচারী, গ্রাম পঞ্চায়েতের আয়ের উৎস , মূল্যায়ন এবং ত্রুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি।
![]() |
| গ্রাম পঞ্চায়েতের কার্যাবলী, নির্বাচন, গঠন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা বিস্তারিত আলোচনা |
গ্রাম পঞ্চায়েত হল পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের বা প্রথম স্তর। পূর্বের গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থাগুলিকে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা বা Rural Self-Government বলা হত। কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের নতুন সংশোধন অনুসারে পঞ্চায়েতগুলি হল—সরকার, এককথায় যাকে গ্রামীণ সরকার বা Rural Government বলা হয়। অবশ্য স্বায়ত্তশাসিত সরকার বললেও ভুল বলা হয় না।
এলাকা
সাধারণত একটি বা কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি গ্রাম পঞ্চায়েত গঠিত হয়। গ্রামের নাম অনুসারে পঞ্চায়েতের নাম হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য, একটি মৌজা, একাধিক মৌজা বা কোনো একটি মৌজার অংশবিশেষ নিয়ে একটি গ্রাম তৈরি হয়। তাই গ্রাম বলতে উভয়কেই বোঝানো হয়।
গঠন
প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য সংখ্যা হবে কমপক্ষে 5 থেকে সর্বাধিক 30-এর মধ্যে। বর্তমানে সর্বাধিক সদস্য সংখ্যা 30 করা হয়েছে। তবে মোট সদস্য সংখ্যা কত হবে, তা পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকরাই ঠিক করে দেন। পূর্বে সাধারণত 500 জন ভোটদাতা পিছু একজন করে পঞ্চায়েত প্রতিনিধি থাকতেন। বর্তমানে 700 ভোটদাতা পিছু একজন করে প্রতিনিধি থাকেন। পঞ্চায়েতকে কয়েকটি নির্বাচনি কেন্দ্র বা ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়। সাধারণত কমপক্ষে তিনটি এবং সর্বাধিক 14টি নির্বাচনি কেন্দ্র থাকে। প্রতিটি নির্বাচনি কেন্দ্র থেকে সর্বাধিক তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেন। গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যরা সার্বিক প্রাপ্তবয়স্ক (18 বছর) ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। ভোটার তালিকা হিসেবে ধরা হয় সংশ্লিষ্ট গ্রামের বিধানসভার নির্বাচকদের।
1992 খ্রিস্টাব্দের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইনে (সংশোধিত) তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য এবং মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে। মহিলাদের জন্য গ্রাম পঞ্চায়েতের এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে।
প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত গঠিত হবে নির্বাচিত সদস্য, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ও সহ-সভাপতি, এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা থেকে নির্বাচিত পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যদের নিয়ে। তবে পঞ্চায়েত সমিতির যেসব সদস্য পদাধিকারবলে গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য হন, তাঁরা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান বা উপপ্রধান হতে পারবেন না। এমনকি তাঁরা ভোট দিতেও পারবেন না। সাধারণত একটি পঞ্চায়েতে তিনজন পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য থাকেন।
প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা
গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রার্থীপদের বা সদস্যদের কিছু যোগ্যতার কথা নতুন সংবিধান সংশোধনে বলা হয়েছে। যোগ্যতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে পঞ্চায়েত সমিতি, জেলাপরিষদ বা পৌরসভার সদস্য, সরকারি কর্মচারী বা কোনো পঞ্চায়েতের কর্মচারী, সরকার পরিচালিত কোনো সংস্থা বা কোনো সমবায়ের বরখাস্ত কর্মচারীরা গ্রাম মাসের বেশি কারাদণ্ড ভোগ পঞ্চায়েতের সদস্য হতে পারবেন না। নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে যে,দেউলিয়া নন, বিকৃত মস্তিষ্ক নন, এমন ব্যক্তিরাই গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য হতে পারবেন। অযোগ্যতার ক্ষেত্রে আরও বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি পঞ্চায়েতের কর, মাশুল বা শুল্ক বাকি রেখেছেন তিনিও গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না।
কার্যকাল
পূর্বে পশ্চিমবঙ্গের মূল পঞ্চায়েত আইনে গ্রাম পঞ্চায়েতের মেয়াদকাল ছিল 4 বছর। কিন্তু 1983 খ্রিস্টাব্দের পঞ্চায়েত আইনে (সংশোধিত) পঞ্চায়েতের মেয়াদকাল 1 বছর বাড়িয়ে 5 বছর করা হয়েছে। বর্তমানেও এই নিয়মই প্রযোজ্য। আইন অনুসারে পঞ্চায়েতের 5 বছর পূর্ণ হওয়ার 6 মাসের মধ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতের সাধারণ নির্বাচন করতে হবে। তবে উক্ত গ্রামে বা এলাকায় যদি বিশেষ কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে রাজ্য সরকার যদি মনে করে যে, উক্ত গ্রামে নির্বাচন করা অসম্ভব তাহলে সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েতের কার্যকাল একাদিক্রমে 6 মাস পর্যন্ত বাড়াতে পারে এবং এই বৃদ্ধি সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে হবে। এর বেশি মেয়াদ বাড়াতে হলে রাজ্য আইনসভার অনুমোদন প্রয়োজন।
পদত্যাগ
গ্রাম পঞ্চায়েতের যে-কোনো সদস্য মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ইচ্ছা করলে পদত্যাগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে তাঁকে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক (Block Development Officer)-এর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠাতে হবে। ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলে তার তিরিশ দিনের মধ্যেই উক্ত সদস্যকে জানাতে হবে।
পদচ্যুতি
গ্রাম পঞ্চায়েতের যে-কোনো সদস্য মেয়াদ শেষের আগে বিশেষ কারণে পদচ্যুতও হতে পারেন। পঞ্চায়েতের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কতকগুলি কারণের ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে মহকুমাশাসক (SDO) উক্ত ব্যক্তিকে পদচ্যুত করতে পারেন।
এই অভিযোগ বা কারণগুলি হল— পরপর 3টি সভায় উপস্থিত না থাকা।
নীতিহীন কাজের জন্য ফৌজদারি আদালত কর্তৃক 6 মাসের বেশি কারাদণ্ড ভোগ।
কর, শুল্ক বা মাশুল না দেওয়া ইত্যাদি কারণে মহকুমা শাসক উক্ত সদস্যকে পদচ্যুত করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে অভিযুক্ত সদস্যকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। তা ছাড়া এই ধরনের সদস্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক নিযুক্ত নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পদচ্যুতির 30 দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ পাবেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকারী।
উপসমিতি পূর্বে গ্রাম পঞ্চায়েত কোনো উপসমিতি গঠন করতে পারত না। 2003 খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত সংশোধন আইন অনুসারে এখন পঞ্চায়েতগুলি পাঁচটি উপসমিতি গঠন করতে পারে। এগুলি হল—
1) অর্থ ও পরিকল্পনা উপসমিতি;
2)কৃষি ও প্রাণীসম্পদ বিকাশ উপসমিতি;
3)শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য উপসমিতি;
4) নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ উপসমিতি;
5) শিল্প ও পরিকাঠামো উপসমিতি।
প্রধান ও উপপ্রধান নির্বাচন
গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রথম সভা আহ্বান করেন ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক অর্থাৎ, BDO। সেই সভায় নবনির্বাচিত সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান (Pradhan) এবং একজনকে উপপ্রধান নির্বাচন করেন। প্রধান ও উপপ্রধানের মেয়াদকাল পাঁচ বছর। তার আগেই তাঁদের নির্দিষ্ট আইন অনুসারে পঞ্চায়েত সদস্যরা পদচ্যুত করতে পারেন। প্রধান ও উপপ্রধান পদ দুটিই অবৈতনিক। তবে প্রতি মাসে তাঁদের কিছু সম্মান বা দক্ষিণা দেওয়া হয়ে থাকে।
প্রধান ও উপপ্রধানের কার্যাবলি
গ্রাম পঞ্চায়েতের সভায় প্রধান সভাপতিত্ব করেন। প্রধানের অনুপস্থিতিতে উপপ্রধান সভায় সভাপতিত্ব করেন। গ্রাম পঞ্চায়েতের সামগ্রিক কার্যপরিচালনা, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব প্রধানের। পঞ্চায়েতের সম্পত্তি, দলিল, দস্তাবেজ, নথিপত্র, সিল প্রভৃতি প্রধানের দায়িত্বেই থাকে। পঞ্চায়েতের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি কর্মচারী, অফিসার এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের নিজস্ব কর্মচারীদের কাজের তদারকিও তিনি করে থাকেন। তিনি প্রমাণ সাপেক্ষে পঞ্চায়েতের কোনো কর্মচারীকে 3 মাসের বেতন দিয়ে বা নোটিশ দিয়ে ছাঁটাই করতে পারেন। এ ছাড়া পঞ্চায়েতের অনুমোদনসাপেক্ষে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারেন।
প্রধান উপস্থিত না থাকলে এই সমস্ত দায়দায়িত্ব পালন ও কাজ করে থাকেন উপপ্রধান। এ ছাড়া পঞ্চায়েত প্রধান যে কাজ বা দায়িত্ব উপপ্রধানকে দেবেন তা সম্পন্ন করা উপপ্রধানের কর্তব্য।
গ্রাম পঞ্চায়েতের কার্যাবলি
নতুন আইন অনুসারে গ্রাম পঞ্চায়েতের কার্যাবলিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
কিছু কাজ প্রথম বিভাগে রাখা হয়েছে, যেগুলির উদ্দেশ্য হল গ্রামবাসীদের যৌথ জীবনের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা। এগুলিকে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বলেই চিহ্নিত করা যায়।
দ্বিতীয় বিভাগে সংযুক্ত কাজগুলির উদ্দেশ্য হল গ্রামের অর্থনৈতিক জীবনের উন্নতিসাধন। এগুলিকে অর্পিত কর্তব্য হিসেবেও চিহ্নিত করা যায়।
ও তৃতীয় বিভাগের কাজগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা। এগুলি স্বেচ্ছাধীন কাজের মধ্যে পড়ে।
অবশ্য পালনীয় কর্তব্য :
যৌথ জীবনের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য—
10 জনস্বাস্থ্য ও সঠিক জলনিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
পানীয় জল সরবরাহ ও পানীয় জলের দূষধ করা।
রাস্তাঘাট তৈরি ও মেরামত।
রাস্তায় আলোর ব্যবস্থা করা।
রাস্তার বেআইনি দখল মুক্ত করা।
বসন্ত, ম্যালেরিয়া, কলেরা বা অন্য কোনো ছোঁয়াচে রোগ যাতে না হয় বা না ছড়ায়, তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
যেসব পুকুর, গোচারণ ভূমি, শ্মশান, কবরস্থান প্রভৃতি জনসাধারণ ব্যবহার করে, সেগুলির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা।
সর্বসাধারণের সম্পত্তি ও স্বার্থযুক্ত স্থান সংরক্ষণ করা।
কুয়ো, স্থানীয় পুকুর, খাল, বিল প্রভৃতি খনন করা। রাস্তার ধারে সর্বসাধারণের জন্য বৃক্ষরোপণ করা। সেন্সর বা জনগণনা সম্পর্কিত নথি সংরক্ষণ। আইনানুগভাবে কর, অভিকর, ফি প্রভৃতি ধার্য ও আদায় করা এবং পঞ্চায়েতের বিভিন্ন সূত্রে আয় ও তহবিলের ওপর নজর রাখা।
অর্পিত কর্তব্য
■ গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কাজ : গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের উন্নতির জন্য পঞ্চায়েতকে কিছু কাজ করতে হয়। এগুলি হল—
খাদ্য সংরক্ষণ, খাদি বস্ত্র তৈরি প্রভৃতি বিভিন্ন শিল্প গড়ে তোলা, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠা করা এবং এইসব উদ্যোগকে সংরক্ষণ করা। ও সমবায় প্রথায় চাষ, শিল্প ও অন্যান্য কাজের ব্যবস্থা করা। ও খাদ্য ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহ করা। কৃষির উন্নতি ও প্রসার। হাট, বাজার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ, মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন। গো-পালন, পশুপালন, মাছ চাষ প্রভৃতির জন্য প্রকল্প রচনা ও রূপায়ণ করা, গো-প্রজনন, গো-চিকিৎসা এবং গবাদি পশুর রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা। সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জ্বালানি ও পশু খাদ্যের ব্যবস্থা করা। © পতিত জমি উদ্ধার, জমি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন। গ্রামে বৈদ্যুতিকীকরণের ব্যবস্থা করা। অচিরাচরিত শক্তির উৎস খোঁজা ও ব্যবহার করা। সমবায়ের মাধ্যমে ভূমি ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার। ভূমিসংস্কার। গ্রামীণ আবাসন তৈরি ও সংরক্ষণ। পাঠাগার তৈরি ও পরিচালনা। সাংস্কৃতিক কাজ ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করা।
স্বেচ্ছাধীন কাজ
■ সামাজিক সুবিচার সংক্রান্ত কাজ : সামাজিক ন্যায় ও সুবিচারের স্বার্থে পঞ্চায়েতকে কিছু কাজ করতে হয়। এইসব কাজের মধ্যে আছে—
নিঃস্ব ও দুর্বল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের পরিচর্যা। নারী ও শিশুর উন্নয়ন। গ্রামীণ চিকিৎসালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ও শিশুর পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ। তপশিলি জাতি ও উপজাতির কল্যাণ। বাস্তুহারার পুনর্বাসন। প্রাথমিক, সামাজিক, কারিগরি, পেশাগত শিক্ষা এবং বয়স্কদের জন্য শিক্ষা ও প্রথা বহির্ভূত শিক্ষার ব্যবস্থা। প্রতিবন্ধীদের জন্য কল্যাণমূলক কাজ ও অন্যান্য সমাজকল্যাণমূলক কাজ সংগঠিত করা।
অন্যান্য কার্যাবলি
পঞ্চায়েতের অন্যান্য কর্তব্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাজ্য সরকার যে-কোনো সরকারি ভূসম্পত্তি বা সম্পত্তি পরিচালনা বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রাম পঞ্চায়েতকে দিতে পারে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার এবং জেলাপরিষদও অনুরূপভাবে গ্রাম পঞ্চায়েতকে কোনো কাজের দায়িত্ব দিতে পারে। একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত যুক্তভাবে কোনো জনকল্যাণমূলক কাজ গ্রহণ করতে পারে।
ব্যাপক ক্ষমতা বৃদ্ধি
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নীতি ও কর্মসূচিকে রূপায়ণের উদ্দেশ্যে বর্তমান আইনে গ্রামীণ সরকারের হাতে কাজের সঙ্গে প্রচুর ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জলাশয়ের জল দূষিত হলে, গ্রাম পঞ্চায়েত উক্ত মালিককে জলশোধনের নির্দেশ দিতে পারে। পরিবেশদূষণ বা জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এমন কোনো কাজ কেউ করলে, তা বন্ধের জন্য গ্রাম পঞ্চায়েত নোটিশ দিতে পারে। গ্রাম পঞ্চায়েতের কর্মসচিব ও অন্যান্য কর্মচারী
বর্তমান আইনে—গ্রাম পঞ্চায়েতের কাজকর্ম সঠিকভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে যাতে পরিচালিত হতে পারে, তার জন্য একজন করে কর্মসচিব (Secretary) নিগের ব্যবস্থা আছে। সরকার বা সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ কর্মসচিবকে নিয়োগ করেন। রাজ্য সরকারের আইন অনুসারে তিনি বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে তিনি তাঁর কাজের জন্য প্রধানের মারফত গ্রাম পঞ্চায়েতের কাছে দায়িত্বশীল থাকেন। এ ছাড়া গ্রাম পঞ্চয়েতে একজন কর্মসহায়ক (Job Assistant) নিয়োগের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
ছাড়া গ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের কাজকর্ম ও দায়িত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। পঞ্চায়েতে আরও কয়েক ধরনের কর্মচারী থাকে। যেমন— দফাদার, চৌকিদার প্রভৃতি। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য, গ্রামের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতীক সেই পুরোনো ‘চৌকিদারি’ প্রথা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে চৌকিদার আছে। এখন এরা সরকারের গ্রুপ ডি-এর অন্তর্গত এবং পঞ্চায়েতের সর্বসময়ের স্থায়ী কর্মচারী। বলাবাহুল্য, সব কর্মচারী সম্পূর্ণরূপে গ্রাম পঞ্চায়েতের কাছে দায়বদ্ধ। আয়ের উৎস
সাধারণত গ্রাম পঞ্চায়েতের আয়ের প্রধান উৎস হল
কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার, জেলাপরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি কর্তৃক প্রাপ্ত অনুদান। এ ছাড়া আছে— গ্রাম পঞ্চায়েত কর্তৃক আরোপিত কর, শুল্ক, মাশুল, যানবাহনের লাইসেন্স ফি প্রভৃতি।
1)রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রদেয় ঋণ।
2) কোনো দান থেকে সংগৃহীত অর্থ।
3)জরিমানা এবং অন্যান্য সূত্র থেকে সংগৃহীত আয় বা দান।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সারা ভারতের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্তস্বরূপ। গণতান্ত্রিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের সার্থক প্রয়োগ পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বলা যেতে পারে, নতুন পঞ্চায়েত আইনের প্রয়োগক্ষেত্র রূপে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করা যায়।
মূল্যায়ন
পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েতের ব্যবস্থা ও কার্যাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, সর্বোপরি রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের যে নীতি গ্রহণ করেছে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তা সার্থকতা লাভ করেছে। মজার কথা গান্ধিজির সমালোচক কমিউনিস্ট সরকারের হাত ধরেই গান্ধিজির অন্তত একটি স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। গান্ধির সর্বোদয় সমাজের অন্যতম মূল লক্ষ্যই ছিল গণতান্ত্রিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্র গঠন।
নতুন আইন অনুসারে গ্রামের মানুষের হাতে যেমন ব্যাপক কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনি ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে প্রচুর। অবশ্য ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম পঞ্চায়েতের দায়বদ্ধতার কথাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও গ্রামীণ সরকারের ওপর স্থানীয় গ্রামীণ মানুষের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করা হয়েছে।
এইজন্যই নতুন আইনে গ্রামসভা ও গ্রামসংসদের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তা ছাড়া নিয়মিত পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন, 18 বছরে ভোটাধিকার প্রভৃতির দ্বারা পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা অনেকাংশে সফল—এ কথা বলা যায়। অবশ্য এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা অনস্বীকার্য।
ত্রুটি
তবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির কাজকর্ম একেবারে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এর বেশ কিছু ত্রুটি ও দুর্নীতি ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যদের এক অংশের আর্থিক দুর্নীতি অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তা ছাড়া পঞ্চায়েতের কাজে অত্যধিক রাজনৈতিক দলের প্রভাব ও হস্তক্ষেপ এর উদ্দেশ্যকে কিছুটা ব্যর্থ করছে। দলবাজির ফলে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেকক্ষেত্রে দলগত পার্থক্যের জন্য বৈষম্যমূলক উন্নতি হচ্ছে। এই চিত্র নিঃসন্দেহে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। পঞ্চায়েত প্রধান বা পঞ্চায়েত সদস্য নিজেই যদি দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন, তাহলে সামগ্রিক কাঠামোটাই ভেঙে পড়ে। তবে আশার কথা এই যে, দুর্নীতির প্রভাব সর্বব্যাপী নয়। তাই রাজনৈতিক ও সমাজসচেতন মানুষ নিজেরাই এর প্রতিকার করতে পারবে।

0 Comments