“সভ্যতা ধরেছে আগেই বিজ্ঞানের হাত। রাত তাই দিন হল, দিন হল রাত।”
ভূমিকা : “বিজ্ঞানমুচ্ছিষ্টম্ ইদম্ জগৎ” অর্থাৎ বিজ্ঞানের দ্বারা এ জগৎ উচ্ছিষ্ট। সভ্যতা যদি হয় তবে বিজ্ঞান সেখানে যন্ত্রী। কিন্তু, বিজ্ঞানের এত উন্নতি সত্ত্বেও সভ্যতার কপালে দুশ্চিন্তার কালো রেখা। বিজ্ঞানের জয়যাত্রার মাঝে একদিকে সৃজন অন্যদিকে ধ্বংস। বিজ্ঞানের মারণযজ্ঞে ত্রস্ত মানুষ তাই প্রশ্ন তুলেছে—‘বিজ্ঞান অভিশাপ না আশীর্বাদ?’
বিজ্ঞান কাল থেকে কালান্তরে : মানুষ যেদিন আগুন জ্বালতে শিখল, প্রকৃত অর্থে সেদিনই সভ্যতার প্রদীপ জ্বলল। সভ্যতার ক্রমবিকাশে দেখা দিল নব নব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। মানুষ নিজের প্রয়োজনে সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানকে নিজের প্রয়োজনে কাজে লাগিয়ে, নিজ উদ্দেশ্যসাধন করছে মানুষ। বিজ্ঞান এই অর্থে মূলত মানবকল্যাণমুখী।
বিজ্ঞান বনাম মানুষ : জীবনের নানা ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধি অতি যান্ত্রিকতার অশুভ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। “বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ কেড়ে নিয়েছে আবেগ।” অতিরিক্ত বিজ্ঞান-নির্ভরতা মানুষকে পঙ্গু করেছে। যন্ত্র সভ্যতার মানুষ আজ যন্ত্রতুল্য। মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারাতে বসেছে।
বিজ্ঞানের অশুভ দিক : ‘বাঘ বাঘকে খায় না, কিন্তু বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতায় পাশবিকতা রয়েছে, যে বিজ্ঞান নিয়ত মানুষের কল্যাণকর্মে রত, সেই বিজ্ঞানকেই মানুষ লাগিয়েছে এই সুন্দর সৃষ্টিকে ধ্বংসের কাজে। খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল, মারণাস্ত্রের আবিষ্কার, নিত্যনতুন অশুভ আণবিক শক্তির উদ্ভাবনে মানুষ এখন এত পরিপক্ব যে, একটি ছোট্ট বোতাম টিপলেই মুহূর্তে পৃথিবীর একটি বৃহত্তম অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমার যে বিষময় পরিণতি, তা আজও বিশ্ববাসী ভুলতে পারেনি। আজকের সন্ত্রাসবাদও বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করেছে।
বিজ্ঞান ও ধ্বংস : যে বিজ্ঞান জীবনদায়ী ওষুধ ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করে মানুষকে নবজীবন দান করেছে, সেই বিজ্ঞানই আবার মারণাস্ত্র আবিষ্কার করে জীবনকে ধ্বংসের কাজে ব্যাপৃত থাকছে। এর প্রভাবে পৃথিবীর বায়ু, জল, মৃত্তিকা আজ দূষিত। মঙ্গল ও শুভবুদ্ধি : বিজ্ঞানের ধ্বংসলীলার জন্য বিজ্ঞান দায়ী নয়, দায়ী মানুষ। বিজ্ঞান যদি মানুষের শুভবুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে বিজ্ঞান কেবলমাত্র মানবকল্যাণী রূপে মানুষের ভৃত্য হয়েই থাকবে। আইনস্টাইন বলেছেন, ‘Religion without science is lame, science without religion is dead.' তাই, শুভবুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত বিজ্ঞান মানবকল্যাণে ব্রতী হয়ে আশীর্বাদ রূপে দেখা দেবে।
উপসংহার : মানুষ যদি অমানুষ হয়ে বিজ্ঞানকে হয়ে দুঃখ করে বলেছেন, যদি মানুষ হয়, বিজ্ঞানকে যদি মানবকল্যাণে প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে বিজ্ঞান হবে আশীর্বাদ। আর ধ্বংসের কাজে প্রয়োগ করে, তাহলে বিজ্ঞান হয়ে উঠবে অভিশাপ। এজন্য জনৈক কবি বিজ্ঞানের হয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন -
“বিজ্ঞান বলে দোষ কি আমার কেন মিছে দাও গালি। প্রয়োগের গুণে সুন্দর মুখে তোমরা মাখাও কালি।”
0 Comments