বিজ্ঞান ও কুসংস্কার // বিজ্ঞান ও কুসংস্কার রচনা //science and superstition![]() |
| বিজ্ঞান ও কুসংস্কার // science and superstition //প্রবন্ধ রচনা |
অবৈজ্ঞানিক মন : বিজ্ঞানের কাজ যুক্তি দিয়ে, কুসংস্কারের অবস্থান তার বিপরীতে। বর্তমানে আমরা কুসংস্কারের প্রভাব এড়াতে পারি না। পথে চলি, কুসংস্কারও সঙ্গে সঙ্গে চলে। কুসংস্কারের ভূত ঘাড়ে চেপে আছে। তাকে নামাবার সাহস ও শিক্ষা আজও আমাদের করায়ত্ত হয়নি। আজও সে আমাদেরকে ভয় দেখায়। টিকটিকি ডাকলে অশুভ জ্ঞান করি, হাঁচি পড়লে আমরা থেমে যাই, পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে কপালে দইয়ের ফোঁটা দিয়ে যাই। এসব থেকে মুক্তির উপায় কী?
কুসংস্কার কী?
কুসংস্কার হল মানুষের যুক্তি-বিচারহীন অন্ধবিশ্বাস, মিথ্যা ধারণা। ইংরেজিতে একে বলে যা বহুদিন ধরে চলে আসছে— এমন অন্ধবিশ্বাস মানুষের অজ্ঞতার কারণে কুসংস্কারে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানের যুগেও মানুষ ঝাড়ফুঁক করে, ভূতপ্রেত, ডাইনি, জিন ইত্যাদির ভয়ে মরে।
আধুনিকতা ও বিজ্ঞানচেতনা : প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ প্রকৃতির রহস্য ভেদ করার এবং অবাধ্য প্রকৃতিকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছে। এই চেষ্টার ফলশ্রুতি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানচেতনা। মানবসভ্যতার একদিকে জন্ম নিয়েছে অলৌকিক বিশ্বাস, অন্যদিকে বিজ্ঞানচেতনা। বিজ্ঞান দিয়ে আমরা বিশ্বের অব্যাখ্যাত বিষয়গুলিকে বোঝার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আজও মন থেকে কুসংস্কার সম্পূর্ণ দূর করতে সক্ষম হইনি। অদৃষ্টবাদী, অলৌকিকে বিশ্বাসী মানুষের কাছে বিজ্ঞানচেতনা হার মেনেছে। তবে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন যুক্তিবাদী মানুষ এটুকু বুঝতে শুরু করেছে যে, যুক্তি-তর্কের বাইরে অন্ধবিশ্বাসের কোনো স্থান নেই।
অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্তি : তবে বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান প্রসার মানুষের অন্ধবিশ্বাস ও অসহায় ধর্ম-আনুগত্যের অচলায়তনে আঘাত হেনেছে। মধ্যযুগে ইউরোপে প্রথম মানুষ সন্দেহ প্রকাশ করল ধর্মীয় ব্যাখ্যায়। গড়ে উঠল নতুন এক মূল্যবোধ এবং বিশ্বাস। মানুষ বুঝল, সব প্রাচীন তত্ত্ব, তথ্য এবং মতবাদই চোখ বুজে গ্রহণযোগ্য নয়, বিচার ও যুক্তিশীলতার কষ্টিপাথরে যাচাই করে তবেই গ্রহণীয় হবে সবকিছু। এই সন্দেহের মধ্য দিয়ে মানুষের যথার্থ বিজ্ঞান-যুক্তির প্রতি বিশ্বাস বৃদ্ধি পেল।
অন্ধ কুসংস্কার কাকে বলে? : বিজ্ঞানচেতনার বিপরীতে অবস্থান করছে কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস। একদিকে যখন চলছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা, অন্যদিকে ইংল্যান্ডে তখনও ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে অসহায় নারীদের। ভারতে চলছে সতীদাহ-সহমরণ, চলছে হাঁচি-টিকটিকি, মাদুলি-তাবিজ-কবচ। অতি সুসভ্য সমাজে আজও টিকে রয়েছে এমন ধরনের কত অন্ধবিশ্বাস। কালো বিড়াল সামনে দিয়ে গেলে সুসভ্য ইউরোপের অনেক লোকই আজও গাড়ি থামিয়ে বসে থাকেন। আজও অনেক সুশিক্ষিত মানুষ খাওয়ার টেবিলে তেরো জনে খেতে বসেন না। এ শতকের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন কুসংস্কারের উৎস সম্বন্ধে বলেছিলেন—“It is this undefined source of fear and hope which is the genesis of irrational superstition" ভয় এবং আশার এই অব্যাখ্যাত উৎস থেকেই অযৌক্তিক কুসংস্কারের সৃষ্টি।
Read more : শিক্ষা বিস্তারে গণমাধ্যমের ভূমিকাসামাজিক কুসংস্কার, যা এখনও প্রবল : আধুনিক ভারত যদিও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে, তবু আমাদের দেশ আজও কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ। আজও ডাইনি সন্দেহে হত্যা, শিশুবলির মতো ঘটনা ভারতের বুকে প্রায়শই ঘটে চলেছে। তবু সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং লজ্জাজনক বোধ হয় ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। গণেশ মূর্তির দুধপান। পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় যা পৃষ্ঠটান।
শিক্ষিত মানুষের কুসংস্কার : আমাদের দেশে বিজ্ঞান জেনেও বহু মানুষ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। বৈজ্ঞানিকদের হাতে তাবিজ-কবচ প্রায় দেখা যায়। ডাক্তারেরা নির্ভর করেন জ্যোতিষীর ওপরে। জ্যোতিষীর নির্দেশে বহু শিক্ষিত লোক হাতে গ্রহরত্ন ধারণ করে চলেছেন। এঁরা ‘জলপড়া’ খান চোখ বুজে। গুরু চরণামৃত ভক্তির সঙ্গে পান করেন। বলাবাহুল্য, এসবই অশিক্ষার ফল। তথাকথিত ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষিতদের মনের এসবই হল অন্ধবিশ্বাস ও কুংস্কার। প্রকৃত শিক্ষা হল যুক্তিনিষ্ঠ মনের শিক্ষা। সেই শিক্ষার অভাবেই এইসব কুসংস্কার আজও টিকে আছে।
পথের দিশা : বিজ্ঞান ও কুসংস্কার দুই-ই মানব মনের ফসল। প্রকৃত যুক্তিবাদী মানুষকে তার সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে খুঁজে নিতে হবে সঠিক এবং মঙ্গলকর পথটি। তবেই পৃথিবী এবং মানবজাতির আলোকময় যাত্রাপথ হবে সুনিশ্চত। —দূরীভূত হে কুসংস্কার। নতুবা দুই-ই চলবে পাশিপাশি।

0 Comments